প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২২ পিএম
রাজধানীর অনুমোদনহীন ও নকশাবহির্ভূত ভবনের বিরুদ্ধে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অভিযান চললেও অভিযানের পর একই ভবনে আবার নির্মাণকাজ শুরুর অভিযোগ উঠেছে। কোথাও নির্মাণকাজ বন্ধ, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও মিটার জব্দ করার পরও ভবন নির্মাণ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
এ পরিস্থিতিতে রাজউকের সাব-জোন ৬/২-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমারত পরিদর্শক মো. অমিত হাসানকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর অনিয়ম, প্রভাব খাটানো ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ।
অভিযোগকারীদের দাবি, যাত্রাবাড়ী, দনিয়া, মাতুয়াইল, সারুলিয়া, ডগাইর, সানারপাড়, সিদ্ধিরগঞ্জ ও শিমরাইলের বিস্তীর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণে সহযোগিতা এবং বিভিন্ন কৌশলে ভবন মালিকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। রাজউকের অভিযান, নোটিশ, জরিমানা, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন কিংবা উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে কথিত ‘সমঝোতার’ মাধ্যমে অর্থ দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
অভিযানের ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবির অভিযোগ
একাধিক ভবন মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন, নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শনে গিয়ে প্রথমে নকশার বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে রাজউক কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পরবর্তী সময়ে নোটিশ, জরিমানা, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন কিংবা উচ্ছেদ অভিযানের আশঙ্কা দেখিয়ে তাদের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়। ভবনের আয়তন, তলার সংখ্যা এবং নির্মাণকাজের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে কথিত ‘সমঝোতার’ অঙ্ক নির্ধারণ করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন।
কয়েকজন ভবন মালিকের দাবি, ভবনের আকার যত বড়, কথিত অর্থের দাবিও তত বেশি। তাদের অভিযোগ, রাজউকের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাকে ব্যবহার করে একধরনের চাপ তৈরি করা হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো নির্ভরযোগ্য নথি বা আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
উচ্ছেদের পরও কীভাবে নির্মাণকাজ?
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে রাজউকের অভিযান-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে।
স্থানীয়দের দাবি, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে পরিচালিত অভিযানে কয়েকটি ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়, বৈদ্যুতিক মিটার জব্দ করা হয় এবং নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কিছু ভবনে পরবর্তী সময়ে আবার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। কয়েকটি স্থাপনা বর্তমানে প্রায় সম্পূর্ণ হওয়ার পর্যায়েও রয়েছে বলে অভিযোগ।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, রাজউকের অভিযানে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও একই স্থাপনায় কীভাবে আবার নির্মাণকাজ শুরু হলো। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ চললেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নজরদারি এড়িয়ে এসব নির্মাণকাজ চলেছে, নাকি অভিযান ও পরবর্তী তদারকির মাঝখানে কোনো ধরনের সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মাতুয়াইল-সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় অভিযোগ বাড়ার দাবি
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, মাতুয়াইলের আংশিক এলাকা ও সিদ্ধিরগঞ্জের আংশিক মৌজার দায়িত্ব পাওয়ার পর অমিত হাসানকে ঘিরে অভিযোগ বাড়তে থাকে। নকশাবহির্ভূত নির্মাণ শনাক্ত হওয়ার পর কিছু ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে সেগুলোতে আবার নির্মাণকাজ চলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কোনো ভবনের বিরুদ্ধে রাজউকের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অভিযান-পরবর্তী নজরদারি যথেষ্ট ছিল না। ফলে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
রাজউকের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন
অবৈধ নির্মাণ বন্ধে রাজউকের অভিযান যদি অভিযান শেষ হওয়ার পরই কার্যকারিতা হারায়, তাহলে নগর উন্নয়ন ও ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়ে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সচেতন মহলের অভিযোগ, একদিকে ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে, অন্যদিকে একই স্থাপনায় যদি আবার নির্মাণকাজ চলতে থাকে, তাহলে মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তাদের আশঙ্কা, কোনো কর্মকর্তা বা মধ্যস্থতাকারী যদি উচ্ছেদ কিংবা আইনি ব্যবস্থার ভয়কে ব্যবহার করে অবৈধ সুবিধা আদায়ের সুযোগ পান, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়, রাজউকের সামগ্রিক ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতিকর।
কর্মজীবন ও বর্তমান দায়িত্ব
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার উমেদপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুস সাত্তারের ছেলে মো. অমিত হাসান ২০১৮ সালের ২ জুলাই রাজউকের ইমারত পরিদর্শক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে তিনি রাজউকের সাব-জোন ৬/২-এর দায়িত্বে রয়েছেন।
বর্তমান কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, প্রভাব খাটানো এবং অবৈধ সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ সামনে এসেছে বলে দাবি করছেন অভিযোগকারীরা।
তদন্তে যেসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে রাজউকের সংশ্লিষ্ট নথি, অভিযান পরিচালনার প্রতিবেদন এবং অভিযান-পরবর্তী তদারকির রেকর্ড পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বিশেষ করে যেসব ভবনের বিরুদ্ধে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেসব ভবনে পরবর্তীতে নির্মাণকাজ কীভাবে চলল, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও মিটার জব্দের রেকর্ড, পরবর্তী সময়ে কোনো অনুমোদন বা ছাড় দেওয়া হয়েছিল কি না এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিয়মিত তদারকি করেছেন কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
অমিত হাসানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগগুলোর বিষয়ে মো. অমিত হাসানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
অভিযোগের সত্যতা স্বাধীন তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে উচ্ছেদ অভিযান ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরও যদি একই ভবনে নকশাবহির্ভূত নির্মাণকাজ চলতে থাকে, তাহলে রাজউকের মাঠপর্যায়ের নজরদারি, অভিযান-পরবর্তী তদারকি এবং আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার জবাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।
