প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৩৯ পিএম
"ওকে মারতে যদি আমার এক কোটি টাকা লাগে, আমি এক কোটি টাকা খরচ করব! ওর আমি লাশ ফেলাবো!"
টাকা ফেরত চাইতে যাওয়া ভুক্তভোগী এক যুবকের বিরুদ্ধে ফোনে এভাবেই অকথ্য গালিগালাজ ও সরাসরি খুনের হুমকি দিচ্ছিলেন ‘রিচার্ড ইন্টারন্যাশনাল’-এর কর্ণধার ‘রিচার্ড’। চোখে আধুনিক চশমা, পরনে স্যুট-কোট আর মুখে অনর্গল চীনা ভাষা। ফেসবুকে নিজেকে তুলে ধরেন চীন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে। অথচ নিবিড় অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য—যিনি নিজেকে ‘রিচার্ড’ দাবি করছেন, তিনি আসলে টাঙ্গাইলের গোপালপুরের প্রত্যন্ত হেমনগর ইউনিয়নের বালুবাড়ি গ্রামের সহজ-সরল পরিবারের সন্তান মনিরুজ্জামান মন্টু।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, তার নিজের বৃদ্ধ বাবা-মাও জানেন ছেলে গত এক দশক ধরে চীনে প্রবাস জীবন কাটাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি ঢাকায় বিলাসবহুল অফিসে বসে সাধারণ ডিগ্রিধারী তরুণদের চীনে লোভনীয় চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা।
যেভাবে পাতা হয় ‘রিচার্ড ইন্টারন্যাশনাল’-এর ফাঁদ
রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএসের একটি ভবনে অফিস খুলে বসেছেন মনিরুজ্জামান মন্টু ওরফে রিচার্ড। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ম্যানপাওয়ার চায়না’ ও ‘রিচার্ড ইন্টারন্যাশনাল’ নামের পেজে চটকদার বিজ্ঞাপন দেন তিনি। বিজ্ঞাপনে প্রচার করা হয়—চীন সরকারের ওয়ার্ক পারমিটসহ নিশ্চিত অফিসিয়াল চাকরি, মাসিক বেতন ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা (১০ থেকে ১২ হাজার আরএমবি)।
প্রাথমিকভাবে প্রার্থীদের আকৃষ্ট করতে চীনা ভাষা শিক্ষার কোর্সে ভর্তি করানো হয়। এরপর ধাপে ধাপে ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের নাম করে জনপ্রতি নেওয়া হয় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে স্ট্যাম্পে করা হয় লিখিত চুক্তিপত্র, যেখানে উল্লেখ থাকে—৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে কাজ না হলে টাকা ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু টাকা পাওয়ার পরই বদলে যায় দৃশ্যপট।
ভুক্তভোগীদের দুঃসহ বাস্তবতার গল্প
১. সর্বস্বান্ত মাহমুদুল হাসান মামুন:
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠিত চাকরিজীবী মামুন। চীনে বেড়াতে গিয়ে সেখানে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। রিচার্ড ইন্টারন্যাশনালের মিষ্টি কথায় প্রলুব্ধ হয়ে তিনি বর্তমান চাকরি ছাড়েন এবং সংসারের ফার্নিচার বিক্রি করে ৪ লাখ টাকা তুলে দেন রিচার্ডের হাতে।
মামুন জানান, "আমাকে একের পর এক তারিখ দিয়ে ঘোরানো হচ্ছিল। সপ্তমবার যখন আমার আবেদন রিজেক্ট হলো, তখন টাকা ফেরত চাওয়ায় রিচার্ড ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে ফোন করে হত্যার হুমকি দেয় এবং লাশ ফেলার ঘোষণা দেয়।"
২. বেকারত্বের মুখে হাসান:
আরেক ভুক্তভোগী হাসান। ৩ কিস্তিতে ৪ লাখ টাকা পরিশোধের পর দীর্ঘদিন পার হলেও তাকে পাঠানো হয়নি। উল্টো অফিসে গেলে রিচার্ড দেখা করতে অস্বীকৃতি জানান এবং দুর্ব্যবহার করে অফিস থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
৩. রাকিবের চীন যাত্রা ও প্রতারণার চরম পরিণতি:
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবসায়ী রাকিব (ছদ্মনাম) চীনে নিজের ব্যবসার পরিধি বাড়াতে চেয়েছিলেন। রিচার্ডের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকায় চীনে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন এক ভয়ংকর জালিয়াতি। রাকিব চীনা ভাষা জানতেন না; ইন্টারভিউ চলাকালে রিচার্ড তাকে ‘গুগল ট্রান্সলেট’ ব্যবহার করে উত্তর দিতে বলেন। চীনা কোম্পানির নিয়োগকর্তা ভেবেছিলেন স্বয়ং রিচার্ডই তাদের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করবেন। কিন্তু রাকিব সেখানে পৌঁছানোর পর ভাষা ও দক্ষতার অমিল দেখে কোম্পানি তাকে কাজে নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং ওয়ার্ক পারমিট প্রক্রিয়া আটকে দেয়। রাকিব জানান, "চীনা কোম্পানির মালিক আমাকে সরাসরি জানান যে রিচার্ড একজন প্রতারক। সেখান থেকেও সে কমিশন ও মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছে। বাধ্য হয়ে আমাকে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে।"
এছাড়া চীনে পৌঁছানো আরও কয়েকজন বাংলাদেশি ফোনে জানান, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা ছাড়াই তাদের সেখানে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ফেলে রাখা হয়েছে, যেখানে তারা চরম কষ্টে দিন পার করছেন।
গ্রামে গিয়ে আসল পরিচয়ের মুখোশ উন্মোচন
অনুসন্ধানী টিম সরেজমিনে রিচার্ডের স্থায়ী ঠিকানা টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগরের বালুবাড়ি গ্রামে পৌঁছায়। স্থানীয় বাসিন্দারা ‘রিচার্ড’ নামে কাউকে চিনতে পারেননি। তবে ছবি দেখাতেই স্থানীয়রা জানান, ইনি গ্রামের সহজ-সরল পরিবারের ছেলে মনিরুজ্জামান মন্টু। স্থানীয় একটি বিদ্যালয় থেকে পাস করা মন্টু একসময় এলাকায় ধর্মপরায়ণ ও ভালো ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
জরাজীর্ণ টিনের ঘরে গিয়ে দেখা মেলে মন্টুর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের। সেখানে জানা যায় আরেক নির্মম প্রতারণার গল্প। মন্টুর বাবা জানান, "আমার ছেলে তো ১০ বছরের বেশি সময় ধরে চায়নাতে থাকে।" যখন তাকে জানানো হয় তার ছেলে চীনে নয়, ঢাকার বারিধারায় বিলাসবহুল অফিস খুলে প্রতারণা চালাচ্ছেন, তখন স্তব্ধ হয়ে পড়েন তার পরিবার।
মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ: ‘এআই’ আর ‘শর্ত প্রযোজ্য’-এর অজুহাত
কারওয়ান বাজারে অনুসন্ধানী দলের মুখোমুখি হন মনিরুজ্জামান মন্টু ওরফে রিচার্ড। প্রথমে ইন্টারভিউ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পরে নিজের পক্ষে অদ্ভুত সব যুক্তি তুলে ধরেন তিনি।
- হুমকির অডিও প্রসঙ্গে: মামুনকে দেওয়া অডিওতে হত্যার হুমকির কথা তুলতেই তিনি দাবি করেন, অডিওটি আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ (AI) দিয়ে তৈরি হতে পারে। যদিও এর কিছুক্ষণ আগেই তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে নিজের গালাগালকে ‘পরিস্থিতির শিকার’ বলে যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন।
- চুক্তিভঙ্গ ও টাকা ফেরত না দেওয়া: লিখিত চুক্তিপত্রে টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে তিনি হাসিমুখে দাবি করেন, "বিজ্ঞাপনে যেমন লেখা থাকে ২০০ টাকা বোনাস কিন্তু নিচে ছোট করে লেখা থাকে 'শর্ত প্রযোজ্য', আমার চুক্তিপত্রও তেমন।"
- লাইসেন্সবিহীন ম্যানপাওয়ার ব্যবসা: বিএমইটি (BMET) বা বায়রার কোনো রিক্রুটিং লাইসেন্স (RL) না থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি দাবি করেন, "ম্যানপাওয়ার অর্থ এই না যে আমি ম্যানপাওয়ারের দোকানদার। এটা জাস্ট একটা নাম, নাম মানুষ যেকোনো কিছুই দিতে পারে।"
আইন ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "রিক্রুটিং এজেন্সি হিসেবে বিদেশে কর্মী পাঠাতে হলে সরকারের বাধ্যতামূলক লাইসেন্স (RL) থাকতে হবে। কোনো অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান ভিজিটিং কার্ড বা সোশ্যাল মিডিয়ায় এজেন্সি দাবি করে কর্মী পাঠানোর নামে অর্থ নিলে তা সরাসরি আইন ভঙ্গ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ প্রতারকদের আশ্রয়-প্রশ্রয় প্রসঙ্গে বলেন, "এ ধরনের প্রতারকরা শক্তিশালী ব্যাকগ্রাউন্ড বা অসাধু চক্রের সাথে নেক্সাস গড়ে তোলে। তারা তথাকথিত 'প্রোটেকশন মানি' দিয়ে নিজেদের আধিপত্য জাহির করে এবং সাধারণ মানুষকে ভয় দেখায়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করে, তবে শিক্ষিত-অশিক্ষিত উভয় শ্রেণির নাগরিকই এমন প্রতারণার শিকার হতে থাকবে।"
কূটনৈতিক সতর্কবার্তা ও আইনি প্রেক্ষাপট
প্রাসঙ্গিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাসও সম্প্রতি এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে—কোনো নির্দিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সি বা মধ্যস্বত্বভোগীকে চীনা ভিসা দেওয়ার একক কর্তৃত্ব দেওয়া হয়নি। দূতাবাস স্পষ্ট করেছে, কোনো মধ্যস্থতাকারীর মিথ্যা প্রলোভন, জাল নথিপত্র বা "শতভাগ ভিসা নিশ্চয়তা"র দাবির ফাঁদে যেন আবেদনকারীরা পা না দেন।
লাইসেন্সবিহীন ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে বিদেশের মাটিতে চাকরির মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ আদায় এবং অভিযুক্ত মনিরুজ্জামান মন্টু ওরফে রিচার্ডের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন প্রতারিত যুবকরা।
