প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০২ পিএম
ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে পাচারের পর মহারাষ্ট্রের পুনের একটি যৌনপল্লিতে বিক্রি করে দেওয়া ছয় বাংলাদেশি তরুণীকে উদ্ধার করেছে দেশটির পুলিশ। এই মানব পাচার চক্রের মূল হোতা হিসেবে কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন) সভাপতি এস এম সাদ্দাম হোসাইনের নাম সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশ নিশ্চিত করেছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাদ্দাম ভারতে পালিয়ে যান এবং সেখানে বসেই আন্তসীমান্ত নারী পাচারের এই বিশাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন।
গত বুধবার ভোরে পুনে শহরের ‘বুধবার পেথ’ এলাকার একাধিক নিষিদ্ধ পল্লিতে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ওই ছয় তরুণীকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মানব পাচার ও জোরপূর্বক দেহব্যবসায় বাধ্য করার অভিযোগে চার দালালের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুনের ফরাসখানা থানা-পুলিশ। ইতিমধ্যে চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পলাতক অপর দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
গ্রেপ্তার হওয়া দুই দালাল ও উদ্ধার হওয়া তরুণীদের জিজ্ঞাসাবাদে এই পাচার চক্রের নেপথ্যে থাকা মূল ব্যক্তির নাম বেরিয়ে আসে। ফরাসখানা থানার এক ঊর্ধ্বতন তদন্ত কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্ত ও গ্রেপ্তারকৃত দালালদের জবানবন্দিতে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে বাংলাদেশ থেকে এই তরুণীদের পাচারের মূল কারিগর কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এস এম সাদ্দাম হোসাইন। তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করে দুই দেশের দালালদের সমন্বয়ে এই আন্তর্জাতিক মানব পাচার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ এসেছে। শুধু এই ছয় তরুণীই নন, এর আগেও তাঁর মাধ্যমে একাধিক নারী ভারতে পাচার হয়েছেন। সাদ্দাম হোসাইন ও তাঁর সহযোগীদের আইনের আওতায় আনতে আমাদের বিশেষ টিম কাজ করছে।’
ভারতে বসে সাদ্দামের পাচার সিন্ডিকেট
পুলিশ ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সাদ্দাম হোসাইন ভারতে পালিয়ে যান। বর্তমানে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। সীমান্ত এলাকায় নিজস্ব চোরাচালান সিন্ডিকেট ও পুরোনো অপরাধ নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি এখন ভারতে বসে মানব পাচার ও দেহব্যবসার কারবার পরিচালনা করছেন।
কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা সাদ্দাম হোসাইন ২০২০ সালের নভেম্বরে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির পদ পান। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, পদ পাওয়ার পর কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি শতকোটি টাকার মালিক বনে যান। দেশে থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল জোনে ইয়াবা ও মাদকের সিন্ডিকেট গড়ে তোলা, মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে গরু ও সোনা চোরাচালান, পাহাড় কাটা, জমি দখল এবং কমিটি-বাণিজ্যের মতো বিস্তর অভিযোগ ছিল। সেই পুরোনো সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই এখন বাংলাদেশ থেকে তরুণীদের ভারতে পাচার করা হচ্ছে।
পুনে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুনে পুলিশের উপকমিশনার (অঞ্চল-১) হৃষিকেশ রাওয়ালের নির্দেশে ফরাসখানা, বিশ্রামবাগ ও খাদক থানার সমন্বয়ে একটি বিশেষ যৌথ দল গঠন করা হয়। দলটি বুধবার ভোরে বুধবার পেথ এলাকার নির্দিষ্ট কয়েকটি যৌনপল্লিতে একযোগে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে বন্দিদশা থেকে ছয় তরুণীকে উদ্ধার করে।
উদ্ধার হওয়া তরুণীদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুনে পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রায় চার মাস আগে ভালো বেতনে কাজের লোভ দেখিয়ে তাঁদের বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে সীমান্ত পার করে ভারতে আনা হয়। ভুক্তভোগীদের কারও কাছেই বৈধ পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্র ছিল না। মুম্বাইসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে আকর্ষণীয় চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁদের পুনেতে এনে নিষিদ্ধ পল্লির সর্দারনিদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে দেয় সাদ্দামের পাচারকারী চক্র।
বাংলাদেশ থেকে ভারতে নারী পাচারের এই চক্রটি পুনের বুধবার পেথ এলাকাকে দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসেও একই এলাকার যৌনপল্লিতে অভিযান চালিয়ে দুই দফায় ১৫ জন (ফেব্রুয়ারিতে ১১ জন ও মার্চে ৪ জন) বাংলাদেশি নারী ও কিশোরীকে উদ্ধার করেছিল পুনে সিটি পুলিশ। তাঁদেরও একই কায়দায় চাকরির ফাঁদে ফেলে সীমান্ত পার করে এনে জোরপূর্বক দেহব্যবসায় নামানো হয়েছিল। পুনের পুলিশ কমিশনার অমিতেশ কুমার ইতিমধ্যে বাংলাদেশি নারীদের অবৈধভাবে আটকে রাখা এসব ভবন সিলগালা করার এবং মানব পাচার রোধ আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
