রবিবার ০৮, নভেম্বর ২০২৬

রবিবার ০৮, নভেম্বর ২০২৬ -- : -- --

প্লেট ধোয়া বয় ও সাধারণ টাইপিস্ট: তেল চুরি করে এখন শতকোটি টাকার মালিক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০১:০৯ পিএম

মুহাম্মদ এয়াকুব ও জয়নাল আবেদীন টুটুল

একজনের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল দৈনিক মাত্র ৫০ থেকে ৫৫ টাকা ভাতার বিনিময়ে ক্যান্টিনে এঁটো প্লেট ধুয়ে। আরেকজন ১৯৯০-এর দশকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে ঢুকেছিলেন তৃতীয় শ্রেণির সাধারণ টাইপিস্ট হিসেবে। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডে তৈরি হয় তাঁদের একচ্ছত্র আধিপত্য।

তেল চুরির সিন্ডিকেট, অবৈধ খালাস, বদলি-নিয়োগ বাণিজ্য আর সিবিএ রাজনীতির দাপট খাটিয়ে শূন্য থেকে তাঁরা বনে গেছেন শতকোটি টাকার মালিক।

তাঁরা হলেন যমুনা অয়েলের শ্রমিক ইউনিয়নের (সিবিএ) সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ এয়াকুব এবং ফতুল্লা ডিপোর গেজার (তেল পরিমাপক) ও সিবিএর কার্যকরী সভাপতি জয়নাল আবেদীন ওরফে টুটুল।

জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র হত্যার মামলা, কারাবাস ও আত্মগোপনের মতো গুরুতর ঘটনার পরও তাঁদের দাপট থামেনি। উল্টো রহস্যজনক ক্ষমতাবলে বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করিয়ে স্বপদে ফিরেছেন এয়াকুব। আর সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক প্রহসন ঘটিয়ে তেল চুরির আরেক হোতা পলাতক টুটুলের বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্য করা হয়েছে খোদ এয়াকুবকেই!

প্লেট ধুয়ে দৈনিক ৫০ টাকা, এখন ‘ব্রাজিল বাড়ি’র মালিক
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপো সংশ্লিষ্ট সূত্র ও নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, জয়নাল আবেদীন টুটুলের বাবা ছিলেন ডিপোর একজন সাধারণ নিরাপত্তাকর্মী। বাবার মৃত্যুর পর পেটের দায়ে ডিপোর ক্যান্টিনেই দৈনিক মজুরিভিত্তিতে বয় হিসেবে কাজ শুরু করেন টুটুল। সেখানে প্লেট-বাসন ধুয়ে দিনশেষে পেতেন মাত্র ৫০-৫৫ টাকা।

পরবর্তীতে বাবার কোটায় চতুর্থ শ্রেণির গেজার (তেল পরিমাপক) পদে তাঁর চাকরি স্থায়ী হয়। লোহার কাঠি দিয়ে স্টোরেজ ট্যাংকের তেল পরিমাপের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই পাল্টাতে থাকে তাঁর ভাগ্য। ডিপোর তেলের হিসাবে গড়মিল, ট্যাংক লরিতে কম তেল দেওয়া এবং চোরাই পথে তেল বিক্রি করে গড়ে তোলেন অঘোষিত সিন্ডিকেট।

২০১৮ সালে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার লালপুরে ব্রাজিলের পতাকার আদলে ছয়তলা একটি সুবিশাল ভবন নির্মাণ করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আলোচনায় আসেন তিনি। তৎকালীন ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত নিজে এসে তাঁর ‘ব্রাজিল বাড়ি’ পরিদর্শন করেছিলেন। বাড়িটির পাশেই আরেকটি বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি ও একাধিক গাড়ির মালিক তিনি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে প্রাণহানির ঘটনায় ৩টি হত্যা মামলার আসামি হয়ে টুটুল বর্তমানে পলাতক। তবে অভিযোগ রয়েছে, আত্মগোপনে থেকেও তিনি নিয়মিত খাতায় উপস্থিতি দেখিয়েছেন এবং তাঁর নামে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা মাসোহারা পৌঁছে দেওয়া হতো।

টাইপিস্টের আঙুল ঘুরতেই শতকোটি টাকার সাম্রাজ্য
অন্যদিকে মুহাম্মদ এয়াকুবের উত্থান শুরু টাইপিস্টের চাকরি থেকে। ১৯৯৪ সালে দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে কাজ শুরু করে ১৯৯৭ সালে তৃতীয় শ্রেণির টাইপিস্ট পদে স্থায়ী হন তিনি। তবে দাপ্তরিক টাইপিংয়ের চেয়ে সিবিএ রাজনীতিতেই তাঁর মনোযোগ ছিল বেশি। তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সঙ্গে রাজনৈতিক সংযোগ গড়ে টানা তিন মেয়াদে বাগিয়ে নেন সিবিএর সাধারণ সম্পাদকের পদ।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি এলপি গ্যাস সরবরাহ ও ফার্নেস অয়েলের পরিবহন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেন এয়াকুব। চট্টগ্রাম নগরীর খুলশীর মতো অভিজাত এলাকায় তাঁর রয়েছে চার হাজার ২০০ বর্গফুটের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও একাধিক বাণিজ্যিক প্লট। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় চান্দগাঁওয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার মামলায় ২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর নগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাঁকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করে যমুনা অয়েল। তবে জামিনে বের হয়ে এসেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রভাব খাটিয়ে বরখাস্তের আদেশ বাতিল করিয়ে স্বপদে পুনর্বহাল হন তিনি।

তেল চুরির হরিলুট ও গোপন মাসোহারা
অনুসন্ধানে ফতুল্লা ডিপোকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের এক প্রাতিষ্ঠানিক মাসোহারা সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী:
১. পলাতক থাকা সত্ত্বেও ফতুল্লা ডিপো নিয়ন্ত্রণ রাখতে টুটুলের কাছে প্রতি মাসে নিয়মিত পাঠানো হতো ৩ লাখ টাকা।
২. তেল চুরির ঘটনা গোপন রাখতে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, থানা-পুলিশ এবং ট্যাংক-লরি মালিক ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের নিয়মিত দেড় লাখ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা দেওয়া হতো।

টেলিফোনে জানতে চাইলে ফতুল্লা ডিপো ইনচার্জ এই অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেন।

নিজের বিচার নেই, উল্টো টুটুলের তদন্তে এয়াকুব!
নথি ঘেঁটে দেখা যায়, কারামুক্তির পর এয়াকুবের বিরুদ্ধেও একটি উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের কথা ছিল। কিন্তু প্রভাব খাটিয়ে নিজের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত কমিটি হতে দেননি তিনি। অথচ পলাতক জয়নাল আবেদীন টুটুল কীভাবে দায়িত্বে অনুপস্থিত থেকেও বেতন-ভাতা নিচ্ছিলেন এবং তেল চুরিতে জড়িত ছিলেন—তা তদন্তে কোম্পানি যে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করে, সেখানে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে খোদ মুহাম্মদ এয়াকুবকে! অর্থাৎ, একই ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই সহ-অভিযুক্তের বিচারকের আসনে বসেছেন।

একই প্রতিষ্ঠানের দুই অভিযুক্তের একজন কীভাবে আরেকজনের তদন্ত কর্মকর্তা হন, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, “এটি প্রশাসনিক রীতিনীতি ও প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের চরম পরিহাস। একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি কখনো তাঁর সহযোগীর অপরাধের তদন্তকারী হতে পারেন না। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা শতকোটি টাকার মালিক বনে গেল, অথচ প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃপক্ষ তাদের উল্টো সুরক্ষা দিচ্ছে। দুদককে অবিলম্বে এদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের হিসাব চেয়ে আইনের আওতায় আনতে হবে।”

ইতিমধ্যেই জয়নাল আবেদীন টুটুল ও মুহাম্মদ এয়াকুবের বিপুল সম্পদের খোঁজে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের একটি এনফোর্সমেন্ট দল নারায়ণগঞ্জে টুটুলের ‘ব্রাজিল বাড়ি’ পরিদর্শন করেছে এবং যমুনার ফতুল্লা ডিপো থেকে স্টোরেজ ট্যাংকের ক্যালিব্রেশন চার্ট ও তেল পরিমাপের গুরুত্বপূর্ণ নথি জব্দ করেছে। একইভাবে এয়াকুবের ব্যাংক হিসাব ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বিবরণ চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

Link copied!