রবিবার ০৮, নভেম্বর ২০২৬

রবিবার ০৮, নভেম্বর ২০২৬ -- : -- --

শীর্ষ দৈনিক বাদ, ভূঁইফোড় পত্রিকায় ক্রোড়পত্রের মহোৎসব

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২৯ এএম

ডিএফপির ডিজি খালেদা বেগম এবং উপপরিচালক (বিজ্ঞাপন নিরীক্ষা) মো. রাশেদুজ্জামান

একনজরে:

  • অখ্যাত ও কাগুজে পত্রিকাকে ক্রোড়পত্র পাইয়ে দিতে পত্রিকাভেদে নেওয়া হয়েছে দেড় লাখ টাকা কমিশন।
  • ৮০ থেকে ৯০টি কাগুজে পত্রিকা থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রায় সোয়া কোটি টাকার বেশি অর্থ।
  • অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের (ডিএফপি) ডিজি খালেদা বেগম ও উপপরিচালক (বিজ্ঞাপন নিরীক্ষা) রাশেদের সিন্ডিকেট।
  • উপপরিচালকের টেবিলে তালিকা চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে পাস করিয়ে আনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ।
  • তালিকায় নেই প্রথম আলো, ইত্তেফাক, সমকাল, নয়াদিগন্তের মতো শীর্ষ দৈনিক; ক্ষোভে ফুঁসছে সাংবাদিক মহল।
  • অভিযোগ অস্বীকার করে ডিজি খালেদা বেগমের দাবি—সব তথ্য বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

বাজারে কাটতি নেই, ছাপার কোনো হদিস নেই, এমনকি সাধারণ পাঠকের কাছেও একেবারেই অচেনা—এমন সব কাগুজে ও নামসর্বস্ব পত্রিকাকে সরকারি পূর্ণ পৃষ্ঠার রঙিন ক্রোড়পত্র বরাদ্দ দিয়ে অন্তত সোয়া কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্যের বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের (ডিএফপি) শীর্ষ পর্যায়কে ঘিরে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) খালেদা বেগম এবং উপপরিচালক (বিজ্ঞাপন নিরীক্ষা) মো. রাশেদ।

গতকাল ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত ক্রোড়পত্রের তালিকা প্রকাশের পর এই নজিরবিহীন অনিয়মের চিত্র প্রকাশ্যে আসে।

মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরের ৮৪টি এবং ঢাকার বাইরের ৭৬টিসহ মোট ১৬০টি পত্রিকাকে সরকারি অর্থায়নে এক পূর্ণ পৃষ্ঠার চার রঙের ক্রোড়পত্র প্রকাশের অনুমোদন দেওয়া হয়। ডিএফপির বিজ্ঞাপনের রেট কার্ড অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণির বিল হিসেবে প্রতিটি পত্রিকা কোষাগার থেকে আড়াই থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারবে।

অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট প্রকাশকদের সূত্রে জানা গেছে, এই ১৬০টি পত্রিকার মধ্যে অর্ধেকের বেশি—অন্তত ৮০ থেকে ৯০টি দৈনিক সম্পূর্ণ কাগুজে, অনিয়মিত কিংবা নামসর্বস্ব আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা। এই পত্রিকাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আগেই মধ্যস্থতাকারীদের চুক্তি হয়—তালিকায় নাম তুলতে হলে অফিস খরচ ও অনুমোদন ফি বাবদ অগ্রিম কিংবা বিলের নিশ্চয়তার বিপরীতে দেড় লাখ টাকা নগদ বুঝিয়ে দিতে হবে। 

যেহেতু এসব পত্রিকার সিংহভাগই বাজারে ১০০ কপিও ছাপে না, তাই কোনো প্রকার মুদ্রণ ও বিতরণ ব্যয় ছাড়াই বাকি এক থেকে দেড় লাখ টাকা সরাসরি ঢুকে যাবে পত্রিকার কথিত মালিকদের পকেটে। আর এর বিনিময়ে প্রায় ৮০-৯০টি কাগুজে পত্রিকা থেকে দেড় লাখ টাকা করে তুলে নিয়ে ডিএফপির শীর্ষ সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় সোয়া কোটি থেকে দেড় কোটি টাকার এক বিশাল কমিশন।

ক্রোড়পত্র বণ্টনের পুরো ছকটি কীভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো নিয়মতান্ত্রিক সার্কুলেশন অডিট না করে ডিএফপির উপপরিচালক (বিজ্ঞাপন নিরীক্ষা) রাশেদের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে বসেই কাটতিহীন ও সুবিধাবাদী পত্রিকার তালিকাটি তৈরি করা হয়। 

পরবর্তীতে মহাপরিচালক খালেদা বেগমের আনুষ্ঠানিক সম্মতির পর ডিজি ও উপপরিচালক রাশেদ সরাসরি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে যান। সেখানে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দফতরে গিয়ে তালিকাটির চূড়ান্ত অনুমোদন ও সচিবের স্বাক্ষর নিয়ে আসা হয়। বিজ্ঞাপনের নিরীক্ষা ও স্বচ্ছতা রক্ষার দায়িত্বে থাকা শীর্ষ কর্মকর্তার দপ্তরে বসেই এমন কমিশন ভাগাভাগির তালিকা চূড়ান্ত হওয়াকে চরম নৈতিক স্খলন ও ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল প্রকাশিত ক্রোড়পত্রের তালিকা দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছেন দেশের গণমাধ্যমকর্মীরা। দেশের শীর্ষ ও বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিকগুলোকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই বিতর্কিত তালিকা।

সামাজিক মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিকরা তুলে ধরেন—প্রথম আলো, ইত্তেফাক, বাংলাদেশ প্রতিদিন, সমকাল, দৈনিক সংগ্রাম কিংবা নয়া দিগন্ত-এর মতো পাঠকনন্দিত মূলধারার জাতীয় দৈনিকগুলো এই তালিকায় স্থান পায়নি। অথচ তাদের পাশ কাটিয়ে ক্রোড়পত্র বাগিয়ে নিয়েছে ঢাকা ডায়ালগ, রূপালী দেশ, লাখোকণ্ঠ, ভোরের সংলাপ, আজকের আওয়াজ, স্বদেশ প্রতিদিন, ঐশী বাংলা, সমাবেশ কিংবা খোলা বাজার-এর মতো অখ্যাত সব পত্রিকা। সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতারা এই ঘটনাকে সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় বলে অভিহিত করেছেন।

আঞ্চলিক চরম বৈষম্য ও মন্ত্রণালয়ের অসাধু চক্র:
তালিকায় ভৌগোলিক ক্ষেত্রেও চরম পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। দেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ জেলায় যেখানে নিয়মিত প্রকাশিত স্থানীয় কোনো পত্রিকাকে একটিও ক্রোড়পত্র দেওয়া হয়নি, সেখানে তথ্য মন্ত্রণালয়ের কতিপয় সুবিধাভোগী কর্মকর্তার প্রভাবে ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রায় সবকটি ছোট ও প্রচারহীন পত্রিকাকে ঢালাওভাবে ক্রোড়পত্র দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, মন্ত্রণালয় ও ডিএফপির রাশেদ সিন্ডিকেটের মধ্যে সমঝোতার ফলেই এমন চরম বৈষম্যমূলক বণ্টন সম্ভব হয়েছে।

তবে এই অভিযোগের বিপরীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ মহাপরিচালক খালেদা বেগমকে ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও ধার্মিক কর্মকর্তা দাবি করে তার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তাদের দাবি, ডিএফপির চেয়েও তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভেতরের কোনো অসাধু চক্র হয়তো ডিজিকে ফাঁদে ফেলতে এই বিতর্কিত তালিকা করিয়ে থাকতে পারে। 

এদিকে কমিশন নেওয়া ও কোটি টাকার বাণিজ্যের যাবতীয় অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন ডিএফপির মহাপরিচালক খালেদা বেগম। তিনি বলেন, দেড় লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে ক্রোড়পত্র দেওয়ার তথ্য সম্পূর্ণ মিথ্যা, কাল্পনিক ও বানোয়াট। বিদ্যমান সরকারি মিডিয়া তালিকাভুক্তির নিয়ম অনুসারেই প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। বাইরে কোনো সিন্ডিকেট টাকা দাবি করলে তার দায় অধিদপ্তরের নয়। এছাড়া আদেশের শর্তে স্পষ্ট বলা আছে—নিয়মিত প্রকাশনা ও সন্তোষজনক প্রচারসংখ্যা না থাকলে কোনো পত্রিকাকে বিল দেওয়া হবে না। বিল পাসের আগে প্রতিটি পত্রিকার প্রিন্ট কপি কঠোরভাবে অডিট করা হবে।

অন্যদিকে অভিযোগের তীর যাঁর দিকে, সেই উপপরিচালক (বিজ্ঞাপন নিরীক্ষা) মো. রাশেদের দপ্তরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ বিষয়ে তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কোটি কোটি টাকা অপচয় এবং কাগুজে পত্রিকার নামে সোয়া কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্যের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে সংবাদমাধ্যমে। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগের সময়েও এমন দুর্নীতি বহাল থাকায় অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দিয়ে ডিএফপির ডিজি খালেদা বেগম ও উপপরিচালক রাশেদসহ জড়িত পুরো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন গণমাধ্যমকর্মীরা।

Link copied!