রবিবার ০৮, নভেম্বর ২০২৬

রবিবার ০৮, নভেম্বর ২০২৬ -- : -- --

ভুয়া লিজ ও উচ্ছেদ বাণিজ্য: নেপথ্যে বরখাস্ত মোতোয়াল্লি ও স্থানীয় সিন্ডিকেট

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম

ইসলামি শরিয়াহ ও রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী ওয়াক্ফকৃত সম্পত্তির নিরঙ্কুশ মালিক মহান আল্লাহ। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের এই সম্পত্তি বিক্রি, ব্যক্তিগত মালিকানায় রূপান্তর কিংবা দীর্ঘমেয়াদে হস্তান্তরের কোনো আইনি এখতিয়ার নেই। অথচ খোদ রাজধানীতেই আল্লাহর নামে দান করা শতবর্ষী এক ওয়াক্ফ এস্টেটের জমি গিলে খেতে রীতিমতো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। 

এই ভূমি লুটের পেছনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ওয়াক্ফ প্রশাসনেরই দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবেক এক অফিশিয়াল মোতোয়াল্লি। উচ্চ আদালত দুর্নীতির দায়ে তাঁকে পদচ্যুত ও অযোগ্য ঘোষণা করলেও তাঁর গড়ে তোলা স্থানীয় চক্রটি এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর থানাধীন দুয়ারীপাড়ায় প্রকল্প অফিস খুলে এই চক্রটি রাতের আঁধারে জমি দখল, চাঁদাবাজি ও উচ্ছেদ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।

মোতোয়াল্লির জালিয়াতি ও আদালতের রায়

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিরোধের মূলে রয়েছে ১৮৬৪ সালে তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট আইন উদ্দিন হায়দারের দান করা এবং পরবর্তীতে ১৮৬৮ সালে তাঁর স্ত্রী ফয়জুন্নেসার মাধ্যমে গঠিত ‘আইন উদ্দিন হায়দার ও ফয়জুন্নেসা ওয়াক্ফ এস্টেট’ (ই.সি. নং ৪১১/সি)। সারাদেশে এস্টেটটির বিপুল ভূসম্পত্তি রয়েছে, যার মধ্যে শুধু মিরপুরের দুয়ারীপাড়াতেই রয়েছে প্রায় ১৪০ বিঘা (৪৭.২৪ একর) জমি।

এই ঐতিহাসিক ওয়াক্ফ এস্টেট তদারকির দায়িত্বে থাকা সাবেক অফিশিয়াল মোতোয়াল্লি আবুল কালাম আনসারী (জামাল) নিজেই সম্পত্তি লুটের প্রধান কারিগর হয়ে ওঠেন। আইন অনুযায়ী কোনো মোতোয়াল্লি ওয়াক্ফ প্রশাসকের পূর্বানুমতি ছাড়া তিন বছরের বেশি সময়ের জন্য জমি ইজারা দিতে পারেন না। কিন্তু আবুল কালাম আনসারী নিয়ম ভেঙে ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে দুয়ারীপাড়ার মূল্যবান জমি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ৯৯ বছরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি লিজ দিয়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করেন।

পরবর্তীতে এ সংক্রান্ত এক রিট মামলার রায়ে উচ্চ আদালত আবুল কালাম আনসারীর কর্মকাণ্ডকে স্পষ্ট জালিয়াতি হিসেবে চিহ্নিত করেন। রায়ে উল্লেখ করা হয়, ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে আবুল কালাম আনসারী ওয়াক্ফ সম্পত্তি বেআইনিভাবে ৯৯ বছরের লিজ দিয়েছেন এবং এস্টেটের সুরক্ষায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। উচ্চ আদালত তাঁকে ‘অসৎ, অযোগ্য ও দায়িত্ব পালনে অপারগ’ হিসেবে ঘোষণা করে মোতোয়াল্লির পদ থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করেন।

মোতোয়াল্লির হাত ধরে তৈরি সিন্ডিকেট

আদালতের নির্দেশে আবুল কালাম আনসারী অপসারিত হলেও মাঠপর্যায়ে তাঁর গড়ে তোলা দখলদার চক্রটি নিয়ন্ত্রণ হারায়নি; বরং আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দুয়ারীপাড়ায় তারা ‘প্রকল্প অফিস’ খুলে ওয়াক্ফ সম্পত্তি রক্ষার নামে এক সমান্তরাল রাজত্ব কায়েম করেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই সিন্ডিকেটের পেছনে স্থানীয় সাত-আটজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সরাসরি যুক্ত। তারা হলেন:

১. মো. শিহাব উদ্দিন: প্রকল্প অফিসের অন্যতম নিয়ন্ত্রক। মাঠপর্যায়ে কাকে কোন জমি দেওয়া হবে এবং কীভাবে দখল বজায় রাখা হবে, তা তাঁর নির্দেশেই পরিচালিত হয়।

২. শিপু মোল্লা: ক্যাডার বাহিনী পরিচালনা এবং নতুন প্লটগ্রহীতাদের ভবন নির্মাণকাজে সরাসরি বাধা দেওয়ার প্রধান ব্যক্তি।

৩. জাকির হোসেন শান্ত ও মো. জামাল উদ্দিন: রাতের আঁধারে টিনের বেড়া দিয়ে জমি দখল এবং ভুয়া লিজ দলিলের আইনি ফাঁকফোকর তদারকির সঙ্গে যুক্ত।

৪. কামাল ওরফে সিএনজি কামাল: এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি, অস্ত্র প্রদর্শন ও সাধারণ মানুষকে এলাকাছাড়া করার দায়িত্বে থাকা মাঠপর্যায়ের নেতা।

৫. মোবারক হোসেন মেম্বার ও আমজেদ মোল্লা: স্থানীয় সালিসের নামে ভুক্তভোগীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নির্মাণকাজ বন্ধ করিয়ে বড় অঙ্কের চাঁদা দাবির সঙ্গে জড়িত।

৬. মোহাম্মদ হিরন: জমি চিহ্নিত করে ভুয়া প্রকল্প অফিসের রসিদ ও টোকেন বাণিজ্যের দায়িত্বে সক্রিয়।

জাঁতাকলে সাধারণ মানুষ

এই সিন্ডিকেটের পাশাপাশি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ওয়াক্ফ প্রশাসনের দ্বন্দ্বের কারণে সাধারণ মানুষ পথে বসেছে। গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দাবি, ১৯৭২-৭৩ সালে ওই এলাকায় তারা ১৯ একর ৩০ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করেছে। 

একই জমিতে দুই সংস্থার কর্তৃত্বের সুযোগ নিচ্ছে স্থানীয় সিন্ডিকেট। ১৯৯৭ সালে বরখাস্ত মোতোয়াল্লি আবুল কালাম আনসারীর কাছ থেকে আড়াই কাঠা জমি ৯৯ বছরের লিজ নিয়ে দলিল ও খাজনা পরিশোধ করে তিন দশক ধরে বসবাস করছেন মো. আব্দুল হক। এখন গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ তাঁকে উচ্ছেদের নোটিশ দিচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় সিন্ডিকেট রাতে এসে তাঁর টিনের সীমানা প্রাচীর ভেঙে দিচ্ছে।

বিপরীত চিত্র দেখা গেছে মাগুরা থেকে এসে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ থেকে প্লট কেনা মুদাচ্ছের হোসেনের ক্ষেত্রে। তিনি জানান, সহায়-সম্বল বিক্রি করে গৃহায়ন থেকে প্লট কিনে নামজারি ও রাজউকের অনুমোদন নিয়ে আটটি পাইলিং সম্পন্ন করেন। কিন্তু কাজ শুরু করতেই মোবারক মেম্বার, আমজেদ মোল্লা ও শিপু মোল্লার ক্যাডার বাহিনী এসে কাজ বন্ধ করে দেয়। নির্মাণসামগ্রী ফেলে দিয়ে তাঁদের মারধর করা হয় এবং জমি ছাড়তে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।

ওয়াক্ফ অধ্যাদেশ, ১৯৬২ এবং ২০১৩ সালের সংশোধিত ওয়াক্ফ আইন অনুযায়ী, ওয়াক্ফ সম্পত্তি হস্তান্তর বা বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ২০১৩ সালের সংশোধনীতে ওয়াক্ফ জমি দখল ও অবৈধ হস্তান্তরের সহযোগীদের বিরুদ্ধে জামিন-অযোগ্য ফৌজদারি মামলার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। 

অন্যদিকে, সরকারের ভূমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী ধর্মীয় ও ওয়াক্ফ সম্পত্তি অধিগ্রহণ সাধারণত পরিহার করতে হয়। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে অধিগ্রহণ দাবি করলেও তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত বা ডিমারকেশন না করেই ব্যক্তিপর্যায়ে বাণিজ্যিক প্লট হিসেবে বিক্রি করায় বিরোধ স্থায়ী রূপ নিয়েছে।

সেনপাড়ায়ও আবাসন কোম্পানির থাবা

দুয়ারীপাড়ার বাইরেও ওয়াক্ফ সম্পত্তি দখলের থাবা বিস্তৃত হয়েছে। মিরপুর সেনপাড়া পর্বতা মৌজায় নবাব সলিমুল্লাহ বাহাদুরের ওয়াক্ফকৃত ৮ একর ৪৫ শতাংশ জমির এক বিশাল অংশে বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দখল করে রাখা হয়েছে। সিএস ও এসএ রেকর্ডে জমিটি ওয়াক্ফ থাকলেও আরএস ও সিটি জরিপের অসঙ্গতির সুযোগ নিয়ে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।

ওয়াক্ফ প্রশাসক মো. সাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ওয়াক্ফ সম্পত্তি আল্লাহর নামে উৎসর্গীকৃত, এর মালিকানা পরিবর্তন করার ক্ষমতা কারও নেই। মোতোয়াল্লি বা যে চক্রই লিজ দিক না কেন, তা আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ। দখলদারদের উচ্ছেদ করে এসব জমি রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্ধার করা হবে।

অধিগ্রহণ নিয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এল.এ.) মো. মাহাবুব উল্লাহ মজুমদার বলেন, আইনত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ এড়িয়ে চলার নিয়ম থাকলেও জনস্বার্থে প্রয়োজনে যে কোনো জমি অধিগ্রহণের আইনি ক্ষমতা জেলা প্রশাসনের রয়েছে।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মোমিনুর রশীদ জানান, পুরোনো সিএস ও এসএ রেকর্ডে ওয়াক্ফ থাকলে নতুন জরিপেও তা ওয়াক্ফেই থাকার কথা। ব্যত্যয় ঘটলে আইনি পর্যালোচনার মাধ্যমে তা সংশোধনযোগ্য।

সার্বিক বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একজন চিহ্নিত ও আদালত কর্তৃক বরখাস্ত মোতোয়াল্লির জালিয়াতির সূত্র ধরে স্থানীয় একটি মাফিয়া সিন্ডিকেট বছরের পর বছর ওয়াক্ফ জমি লুট করছে। ওয়াক্ফ প্রশাসন, ভূমি দপ্তর ও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তা এবং যোগসাজশ ছাড়া এমন প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ চলতে পারে না। অবিলম্বে প্রকল্প অফিসের নামে পরিচালিত এই সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় এনে ফৌজদারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

Link copied!