প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৫৫ পিএম
শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন করাই যেখানে এক কঠিন লড়াই, সেখানে জীবনে কোনো দিন যে জেলায় পা রাখেননি, সেই জেলার একটি ফৌজদারি মামলায় আসামি করা হয়েছে এক শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে। শুধু তা-ই নয়, মামলায় তাঁর পরিবারের নিরীহ সদস্যদেরও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জড়ানো হয়েছে। এর পেছনে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি এবং ফোনে একের পর এক মামলার হুমকির অভিযোগ এনে প্রতিকার চেয়ে হবিগঞ্জে এক সংবাদ সম্মেলন করেছে ভুক্তভোগী পরিবার।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি লিখিত বক্তব্যে ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, তাঁর শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে দূরদূরান্তে যাতায়াত করাই অসম্ভব। অথচ সম্পূর্ণ কাল্পনিক অভিযোগে হবিগঞ্জের একটি মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি জীবনে কখনো হবিগঞ্জ জেলাতেই যাইনি। আমার প্রশ্ন, আমি কোথায়, কখন এবং কীভাবে কথিত অপরাধে জড়িত ছিলাম? এর কি কোনো প্রত্যক্ষদর্শী কিংবা বাস্তব প্রমাণ তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের কাছে আছে?’
মামলার এজাহার পর্যালোচনার দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট মামলায় ২ নম্বর থেকে ৭ নম্বর আসামি হিসেবে মো. নুরুল হক, মোছা. রঞ্জনা খাতুন ও মোছা. রোকেয়া খাতুনসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের জড়ানো হয়েছে। কিন্তু এজাহারে তাঁদের কারও বিরুদ্ধেই কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধ, প্রত্যক্ষ ভূমিকা কিংবা বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তি নেই। কেবল আর্থিক সুবিধা আদায় ও সামাজিকভাবে ঘায়েল করতে পুরো পরিবারকে এভাবে মানসিক চাপে রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়।
টাকা দাবি ও হুমকির নেপথ্যে ‘ডা. নাজমুল করিম’
সংবাদ সম্মেলনে ডা. নাজমুল করিম নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থ দাবি ও ব্লাকমেইলিংয়ের সরাসরি অভিযোগ তোলা হয়। ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, ওই ব্যক্তি বিভিন্ন সময় মুঠোফোনে কল করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেছেন। টাকা না দিলে দেশের বিভিন্ন স্থান এমনকি বিদেশেও একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলার হুমকি দিচ্ছেন।
একই সঙ্গে ওই ব্যক্তির ডাক্তারি পদবি ও পেশাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তিনি আদৌ কোনো নিবন্ধিত চিকিৎসক কি না, নাকি চিকিৎসার পরিচয় ব্যবহার করে নিরীহ মানুষের কাছ থেকে চাঁদাবাজি ও ভীতি প্রদর্শনের ফাঁদ পেতেছেন—তা পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান তাঁরা।
আইনগত দিক ও ডিজিটাল প্রমাণের আহ্বান
আইনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী সমাজে একজন প্রতিবন্ধী নাগরিকের সমান মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং যেকোনো ধরনের হয়রানি থেকে সুরক্ষা পাওয়ার স্পষ্ট অধিকার রয়েছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিতি ছাড়া দূরবর্তী জেলার মামলায় কাউকে জড়ানো হলে ডিজিটাল সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই করাই সত্য উদঘাটনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।
সংবাদ সম্মেলন থেকে ভুক্তভোগী পক্ষ জোরালো দাবি জানায়, ঘটনার দিনের মুঠোফোনের টাওয়ার লোকেশন (সিডিআর), কল রেকর্ডস, অডিও রেকর্ডিং ও খুদে বার্তা (এসএমএস) প্রযুক্তিগতভাবে পরীক্ষা করলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে যে ভুক্তভোগী কখনো হবিগঞ্জে ছিলেন না।
সুবিচারের আকুতি
সংবাদ সম্মেলনের শেষপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে ভুক্তভোগী শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বলেন, ‘আমি কারও বিরুদ্ধে শত্রুতা মেটাতে এখানে আসিনি। একজন প্রতিবন্ধী মানুষ হিসেবে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার সবার মতো আমারও আছে। এই মিথ্যা মামলার কারণে আমার পুরো পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক অপমানের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।’
ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে অবিলম্বে মো. নুরুল হক, মোছা. রঞ্জনা খাতুন ও মোছা. রোকেয়া খাতুনসহ নিরপরাধ ব্যক্তিদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে চাঁদাবাজির হুমকিদাতা ও মিথ্যা মামলার চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে ভুক্তভোগী পরিবার।
