প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২০ পিএম
রাজধানীর কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরে পণ্য খালাস ও রাজস্ব আদায়কে ঘিরে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মঈনুল হোসেন এবং কাস্টমসের কর্মকর্তা খাদিজা পারভীন সুমিকে ঘিরে অনিয়ম ও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার, দায়িত্ব ও বদলি নিয়ে চাপ সৃষ্টি এবং ঘোষণার ভিত্তিতে পণ্য খালাসের সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সুবিধা নিয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট চালানের বিল অব এন্ট্রি, ঘোষণাপত্র, পণ্য পরীক্ষার রেকর্ড, মূল্যায়ন, শুল্ক পরিশোধের হিসাব এবং দায়িত্ব ও বদলি-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করলেই অভিযোগগুলোর প্রকৃত ভিত্তি স্পষ্ট হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বাসিন্দা মঈনুল হোসেন কাস্টমস-সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত হওয়ার পর সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায় প্রবেশ করেন। ২০১৮ সালে কমলাপুর কাস্টম হাউসে শিট খালাসের কাজ শুরু করার পর তার ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে পারভীন ট্রেডার্স ও মা অ্যাসোসিয়েট নামের দুটি সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্সের মাধ্যমে মঈনুল হোসেন শিট আমদানির বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন বলেও অভিযোগকারীদের দাবি। কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি করে পণ্য খালাসে বিশেষ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
১১ মাসে ৫১ হাজার টন শিট খালাসের দাবি
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো খাদিজা পারভীন সুমি আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকা প্রায় ১১ মাসের সময়কাল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই সময়ে মঈনুল হোসেনের পারভীন ট্রেডার্সের মাধ্যমে প্রায় ৫১ হাজার টন শিট খালাস হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ হাজার টন ছিল তুলনামূলক কম শুল্কের এইচআর ও সিআর শিট।
অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু চালানে ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে বাস্তবে আমদানি করা পণ্যের মিল ছিল না। উচ্চ শুল্কের পণ্যকে কম শুল্কের পণ্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তাদের আরও দাবি, এসব চালানে নিয়ম অনুযায়ী কায়িক পরীক্ষা না হওয়ায় ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে প্রকৃত পণ্যের পার্থক্য শনাক্ত করার সুযোগ কমে যায়। এতে প্রতি টনে কয়েক হাজার টাকা করে রাজস্ব ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
তবে মোট রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের জন্য প্রতিটি চালানের পণ্য শ্রেণিবিন্যাস, মূল্যায়ন, বিল অব এন্ট্রি এবং শুল্ক পরিশোধের নথি পরীক্ষা করা জরুরি।
অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়ে মঈনুল হোসেনের কোনো চালানই যথাযথভাবে খুলে পরীক্ষা করা হয়নি। পণ্য খালাসের তদারকিতে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কামরুল ও শাহ আলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
নতুন কর্মকর্তা আসার পর সাত চালানে অসঙ্গতির দাবি
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, খাদিজা পারভীন সুমিকে আনস্টাফিংয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ৪০ ব্যাচের সহকারী কমিশনার আসিফ আহমেদ অনিককে দায়িত্ব দেওয়ার পর পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে।
নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মঈনুল হোসেনের পারভীন ট্রেডার্সের কয়েকটি চালানে তল্লাশি চালান বলে জানা গেছে। সূত্রগুলোর দাবি, সাতটি চালানে ঘোষণার সঙ্গে আমদানি করা পণ্যের অসঙ্গতি শনাক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে এসব ঘটনায় কমিশনারের মাধ্যমে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
এই ঘটনার পরই প্রশ্ন উঠেছে, একই ধরনের চালান আগে নিয়মিতভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বাইরে থেকে খালাস হয়ে থাকলে তার কারণ কী ছিল এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল।
কর্মকর্তা বদল ঘিরেও প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দাবি, নতুন সহকারী কমিশনার দায়িত্ব নেওয়ার পর কম শুল্কের এইচআর ও সিআর শিটের খালাস উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একই সময়ে তুলনামূলক বেশি শুল্কের জিপি শিট হিসেবে খালাসের হার প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছায় বলেও দাবি করা হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, নিয়ম মেনে কাজ শুরু করার এক সপ্তাহের মধ্যেই ওই কর্মকর্তাকে আনস্টাফিংয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে ৪১ ব্যাচের আরেক কর্মকর্তা সামিয়া তাইছিরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তবে বদলি বা দায়িত্ব পরিবর্তনের পেছনে প্রশাসনিক কারণও থাকতে পারে। তাই কোনো কর্মকর্তার দায়িত্ব পরিবর্তনকে অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করার আগে সংশ্লিষ্ট আদেশ, প্রশাসনিক কারণ ও দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
এনবিআর-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগ রয়েছে, খাদিজা পারভীন সুমির স্বামী প্রশাসন ক্যাডারের ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তা। অভিযোগকারীদের দাবি, এই প্রশাসনিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে সুমি কাস্টমসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন।
আনস্টাফিংয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও শিটের অ্যাসেসমেন্ট গ্রুপ-সংক্রান্ত কার্যক্রমে তার প্রভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে কোনো কর্মকর্তার স্বামী বা পরিবারের সদস্যের সরকারি পদমর্যাদা নিজে কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। এ ধরনের অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য দায়িত্ব বণ্টন, পদায়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট চালানের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ছুটির দিনে ৮২০ টন শিট খালাসের অভিযোগ
কমলাপুর কাস্টম হাউসের কার্যক্রম নিয়ে আরও কিছু প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, শুল্ক ফাঁকির অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে সিআইসির এক উপপরিচালককে কুমিল্লায় বদলি করা হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে কোনো আদেশ বা নথি প্রকাশ্যে না থাকায় বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া সাবেক এক কমিশনারের বিদায়ের পর সরকারি ছুটির দিনে মাত্র দুই ঘণ্টায় প্রায় ৮২০ টন শিট খালাসের অভিযোগও উঠেছে। এত বিপুল পরিমাণ পণ্য এত অল্প সময়ে কীভাবে খালাস হলো, ওই সময়ে দায়িত্বে কারা ছিলেন এবং চালানগুলোতে কী ধরনের যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রাজস্ব সুরক্ষায় নথি যাচাইয়ের দাবি
কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরে ঘোষণার সঙ্গে প্রকৃত পণ্যের অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো চালান নিয়মিতভাবে খালাস হয়ে থাকে, তাহলে শুধু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট নয়, পুরো খালাস প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বশীলদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
বিশেষ করে প্রায় ১১ মাসে ৫১ হাজার টন শিট খালাসের দাবি, সাতটি চালানে ঘোষণার অসঙ্গতি শনাক্ত হওয়ার পর প্রায় ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং পরবর্তী সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পরিবর্তনের বিষয়গুলো পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিটি চালানের বিল অব এন্ট্রি, ঘোষণাপত্র, পণ্য পরীক্ষার রেকর্ড, অ্যাসেসমেন্ট নথি, মূল্যায়ন, শুল্ক পরিশোধের হিসাব এবং আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বদলি ও পদায়নের আদেশও পরীক্ষা করা জরুরি।
মঈনুল হোসেন, খাদিজা পারভীন সুমি এবং প্রতিবেদনে অভিযোগের সঙ্গে যাদের নাম এসেছে, তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
অভিযোগগুলো নথিপত্রের মাধ্যমে সত্য প্রমাণিত হলে বিষয়টি শুধু সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং কাস্টমসের পণ্য মূল্যায়ন, পরীক্ষা ও খালাস ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে।
