প্রকাশিত: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৪ পিএম
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সার্কেল কার্যালয়ে সেবা পেতে হলে দালালের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। ভুক্তভোগী, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, এই কার্যালয়ে পিয়ন থেকে শীর্ষ কর্মকর্তা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে সংঘবদ্ধ অনিয়ম চলছে। ফেল করা প্রার্থীও টাকার বিনিময়ে পাস করছেন, আর সরকার নির্ধারিত ফির কয়েক গুণ টাকা দিয়েও মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর লাইসেন্সের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই কার্যালয়ের অনিয়মের কেন্দ্রে রয়েছেন সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মো. ফারুক আলম (অতিরিক্ত দায়িত্বে) এবং মোটরযান পরিদর্শক সেলিম হাসান। ফারুক আলমের বর্তমান কর্মস্থল কুমিল্লা। এর আগে রংপুর ও কুমিল্লায় দায়িত্ব পালনকালেও দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে তিনি আলোচনায় এসেছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়। তাঁর বিরুদ্ধে নামে-বেনামে অবৈধ সম্পদ গড়ার অভিযোগও রয়েছে।
সবচেয়ে বহুল আলোচিত অভিযোগ লাইসেন্সের লিখিত পরীক্ষা নিয়ে। ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০ নম্বরের পরীক্ষায় পাস নম্বর ৮। কিন্তু কেউ ৫-৬, ৩-৪ এমনকি শূন্য পেলেও সমস্যা হয় না, যদি দালালের মাধ্যমে সরকারি ফির বাইরে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। তখন দুপুরে ফল ঘোষণায় যে প্রার্থী অকৃতকার্য, সন্ধ্যার মধ্যেই তাঁর নাম উঠে আসে কৃতকার্যদের তালিকায়। কখনো ওয়েটিং বা বর্ধিত তালিকায় ফেল করা প্রার্থীদের নাম ‘স্বমহিমায়’ হাজির হয়। এই কারণে অফিসের ভেতরে ও বাইরে কথাটি প্রচলিত হয়ে গেছে।
অভিযোগ আছে, সাদা খাতা জমা দেওয়া প্রার্থী, এমনকি যাঁরা লেখাপড়া জানেন না, তাঁরাও ২০ হাজার টাকা বাড়তি দিলে ১৫-১৬ দিনের মধ্যে ভারী যানবাহনের শিক্ষানবিশ (লার্নার) লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছেন।
এই অনিয়মের ফল শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে না। অদক্ষ চালক মহাসড়কে বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে প্রাণহানির কারণ হচ্ছেন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি হিসাবে দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার মানুষ মারা যান। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা কয়েকটি গবেষণা সংস্থার হিসাবে এই সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে সাধারণত অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত গতি ও মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর কথা বলা হয়। কিন্তু অযোগ্য চালককে লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠানের, সেই প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির প্রশ্ন আলোচনায় আসে কম।
ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতায় চিত্রটি আরও স্পষ্ট। রায়হান গত পাঁচ বছর ধরে মোটরসাইকেলে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে কর্মস্থলে যাতায়াত করেন। তিন বছর আগে কাগজপত্র ও ফি জমা দিলেও নানা জটিলতার কথা বলে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে লাইসেন্স না থাকায় পথে বহুবার জরিমানা গুনতে হয়েছে তাঁকে।
নবীনগর উপজেলায় একটি বেসরকারি সংস্থার ফিল্ড অফিসার এমদাদ হোসেন প্রতিবেদককে বলেন, ২০২৫ সালে মোটরসাইকেলের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে সব ধাপ শেষ করার পর ভাইভায় তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি কারও মাধ্যমে এসেছেন কি না। ‘না’ বলায় তাঁকে বের করে দেওয়া হয়। পরে সরকারি ফি আড়াই হাজার টাকা হলেও বিআরটিএর স্টাফ সজীব হাসানের মাধ্যমে ১২ হাজার টাকায় চুক্তি করেন। এরপরও ঘুরতে হচ্ছে তাঁকে। তাঁর কথায়, ‘ঘুরাঘুরি করতে করতে আমি একদম ত্যক্তবিরক্ত।’
বিজয়নগরের কালাছড়া গ্রামের সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক রোমান মিয়া জানান, ২০১৮ সালে লাইসেন্সের জন্য এক দালালকে ১২ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। কয়েক দিন ঘুরিয়ে সেই দালাল উধাও হয়ে যান। পরে কসবার কামালপুরের দালাল শাহ আলমের সঙ্গে ১৮ হাজার টাকায় চুক্তি করেন। এর পরও প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেছে, লাইসেন্স মেলেনি।
সরেজমিনে বিআরটিএ ব্রাহ্মণবাড়িয়া কার্যালয়ে গিয়ে রায়হানের মতো আরও কয়েকজনকে নানা সমস্যা নিয়ে আশপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সার্কেল কার্যালয় প্রায় এক যুগ ধরে চিহ্নিত কয়েকজন দালালের নিয়ন্ত্রণে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে এঁদের মধ্যে জাবেদ, ইব্রাহিম, আজাদ, শাহ আলম, মোস্তাকিম, আবুল, খোকন, শরীফ, সামীর ও আহসানের নাম উঠে এসেছে। তাঁরা কার্যালয়ের ফটকের সামনে বেঞ্চ পেতে বসেন। আরও কিছু দালাল আশপাশের চায়ের দোকান ও ফটোস্ট্যাটের দোকানে বসে গ্রাহকদের কাছ থেকে কাগজপত্র ও কর্মকর্তাদের চাহিদামতো নগদ টাকা সংগ্রহ করেন। এরপর কাগজপত্রের ছবি মেকানিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ফাতেমা আক্তার প্রিয়ার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেন বলে অভিযোগ।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক সজীব হাসান, অফিস সহায়ক রাশেদ নিজাম এবং ফাতেমা আক্তার প্রিয়ার সঙ্গে এসব দালালের গভীর সখ্য রয়েছে।
নতুন লাইসেন্সের আবেদনের পর প্রথমে লার্নার দেওয়া হয়। এরপর ধাপে ধাপে ব্যবহারিক পরীক্ষা, ভাইভা ও আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়। কিন্তু ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, দালাল ছাড়া এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব। পদে পদে অজুহাত দেখিয়ে আবেদনকারীকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, ফলে বাধ্য হয়েই তাঁরা দালালের কাছে যান। দালালেরা লাইসেন্সপ্রতি ১০-১৫ হাজার থেকে ২০-২৫ হাজার টাকা নেন। ডোপ টেস্ট, ভাইভা, আঙুলের ছাপ, সবকিছুই ‘ম্যানেজ’ করে দেন তাঁরা।
অনিয়ম শুধু ড্রাইভিং লাইসেন্সে সীমাবদ্ধ নয়। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফিটনেস, মালিকানা বদল, রোড পারমিট এবং চোরাই গাড়ির জাল কাগজ তৈরিসহ বিভিন্ন খাত থেকে মাসে (২০ কর্মদিবসে) দেড় থেকে দুই কোটি টাকা অবৈধভাবে আদায় হয় বলে অভিযোগ আছে। দালালদের কমিশন বাদ দিয়ে এর প্রায় ৭০ শতাংশ সহকারী পরিচালক ও মোটরযান পরিদর্শকের কাছে যায়। বাকি ৩০ শতাংশ পদমর্যাদা অনুযায়ী অন্য কর্মচারীদের মধ্যে ভাগ হয়।
বিআরটিএ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তথ্যমতে, জেলায় ২০ থেকে ২২ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে, অথচ লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ৮ হাজার ২৫০টির। এই বিপুল ব্যবধান নিয়মিত তদারকির ঘাটতিরই ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে সহকারী পরিচালক ও মোটরযান পরিদর্শকের হোয়াটসঅ্যাপে কল দেওয়া হয়। তাঁরা কল রিসিভ না করায় তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।
সচেতন এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতি বুধবার ও বৃহস্পতিবার বিকেলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এনফোর্সমেন্ট টিম আকস্মিক অভিযান চালালে অবৈধ টাকাসহ অনেককে হাতেনাতে ধরা সম্ভব। তাঁরা মনে করেন, শুধু দালাল ধরলেই হবে না, দালালদের ছাতা হিসেবে যাঁরা কাজ করছেন, সেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। না হলে সাধারণ মানুষের হয়রানি ও সড়কে অদক্ষ চালকের ঝুঁকি, দুটোই চলতে থাকবে।
