প্রকাশিত: ০৫ জুলাই ২০২৬, ১২:৫১ এএম
অনলাইন ডেস্ক | ফ্রান্স, ৪ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশে অবিলম্বে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর আনুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশ (মোরাটোরিয়াম) ঘোষণা এবং এই নিষ্ঠুর সাজা সম্পূর্ণভাবে বিলোপের দাবিতে বিশ্বব্যাপী গণপ্রচারণা শুরু করেছে ফ্রান্সভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা 'জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স' (জেএমবিএফ)।
শনিবার (৪ জুলাই) প্যারিস থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, "বাংলাদেশ: এখনই মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করুন" শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক পিটিশন চালুর মাধ্যমে এই প্রচারণা শুরু করা হয়েছে।
১,৮০০ বন্দির জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন
জেএমবিএফ তাদের পিটিশনে উল্লেখ করেছে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১,৮০০ ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় কারাগারে বন্দি রয়েছেন। এই পিটিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, আইন মন্ত্রণালয়, জাতীয় সংসদসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি মৃত্যুদণ্ড বিলোপের লক্ষ্যে জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিচার ব্যবস্থার ত্রুটি ও অন্যায়ের ঝুঁকি
সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, মৃত্যুদণ্ড একটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও অপরিবর্তনীয় শাস্তি। কোনো ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত, নির্যাতন বা জোরপূর্বক আদায় করা স্বীকারোক্তি, অবিশ্বস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ, অপর্যাপ্ত আইনি সহায়তা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার ত্রুটির কারণে অনেক সময় নিরপরাধ ব্যক্তিও দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন। আর একবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে সেই অন্যায় আর কখনোই সংশোধন করা সম্ভব নয়।
দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব
পিটিশনে ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক বৈষম্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আর্থিক সংকটের কারণে জীবন-মৃত্যুর মতো সংবেদনশীল মামলাগুলোতে অভিজ্ঞ ও কার্যকর আইনি প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত হন।
ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার ও জেএমবিএফের আহ্বান
জেএমবিএফ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড বিলোপের অর্থ গুরুতর অপরাধের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করা নয়। ভুক্তভোগী পরিবার অবশ্যই সত্য জানা, কার্যকর তদন্ত, ন্যায্য বিচার এবং অপরাধীদের জবাবদিহির অধিকার রাখেন। তবে কোনো নিরপরাধ মানুষের জীবন ঝুঁকিতে না ফেলেও বিকল্প কঠোর শাস্তির মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
সংস্থাটি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছে:
অবিলম্বে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর আনুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশ দেওয়া।
বিদ্যমান মৃত্যুদণ্ডের সাজা বাতিল করে বিকল্প দণ্ডে রূপান্তর করা।
মৃত্যুদণ্ড বিলোপের আইনি প্রক্রিয়া চলাকালীন নতুন করে এই শাস্তি না দেওয়া।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মৃত্যুদণ্ডবিরোধী প্রস্তাবগুলো সমর্থন করা।
জেএমবিএফ সভাপতির বক্তব্য
জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ)-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহানুর ইসলাম বলেন:
“ন্যায্যবিচারের মূল কাজ হওয়া উচিত জীবন রক্ষা করা, মানবিক মর্যাদা সমুন্নত রাখা এবং নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ রাখা। বাংলাদেশের বিচার বিভাগীয় দুর্নীতি, স্বাধীন ও ন্যায্য বিচারের অভাব এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচারিক পদক্ষেপের যে অভিযোগ রয়েছে, তাতে মৃত্যুদণ্ডের অব্যাহত প্রয়োগ অপূরণীয় অন্যায়ের এক উদ্বেগজনক ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই বাংলাদেশকে মৃত্যুদণ্ডবিহীন ন্যায়বিচারের পথ বেছে নিতে হবে।”
মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং মৌলিক স্বাধীনতা সুরক্ষায় জেএমবিএফের চলমান অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই পিটিশনটি চালু করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক এবং সচেতন নাগরিকদের এই পিটিশনে স্বাক্ষর ও তা ব্যাপকভাবে শেয়ার করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
