প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৯ পিএম
অবশেষে ভেঙে দেওয়া হয়েছে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার বহুল আলোচিত ‘দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট’। সেবাপ্রত্যাশীদের হয়রানি, ভুয়া মালিকানা সাজিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে এই শাখার ৬ জন সার্ভেয়ারকে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় বদলি করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই চক্রের সদস্যদের বিপুল অবৈধ সম্পদের খোঁজে পৃথক অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখা-৩–কে দীর্ঘ সময় ধরে হয়রানি ও দুর্নীতির চক্রে জিম্মি করে রেখেছিলেন সার্ভেয়ার কেশব লাল দেব, মো. আব্দুল বারীক, মজিবুল হকসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র। সম্প্রতি তাঁদের দুর্নীতির নানা চিত্র ও সুনির্দিষ্ট কেসস্টাডি তুলে ধরে ‘দৈনিক ইনকিলাব’–এ ৮ ও ১৩ সেপ্টেম্বর পরপর দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে ‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ফেজ-৩’ প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকার লেনদেন এবং একই জমি বারবার অধিগ্রহণ দেখিয়ে ক্ষতিপূরণের নামে সরকারি কোটি কোটি টাকা লোপাটের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনগুলো প্রকাশের পর প্রশাসনে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়। অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় প্রথম দফায় সার্ভেয়ার কেশব লাল দেব ও মো. আব্দুল বারীককে ঢাকার বাইরে বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের (রাজস্ব শাখা) সিনিয়র সহকারী কমিশনার ফয়সাল আল নূর স্বাক্ষরিত এক আদেশে এই দুই সার্ভেয়ারকে গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বদলি করা হয়।
এদিকে এই সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বদলির আদেশ জারি করা হয়েছে। সার্বিক প্রশাসনিক ভাবমূর্তি রক্ষায় এবং দুর্নীতির লাগাম টানতে ২১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখা থেকে জারি করা এক পৃথক অফিস আদেশে (স্মারক নম্বর: ০৫.৪১.৩০০০.০০০.০০৯.১৯.০০০৪.২৫.৪৩৮) এলএ শাখা-৩-এর আরও চারজন সার্ভেয়ারকে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়। তাঁদের মধ্যে সার্ভেয়ার মনিরুল ইসলামকে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে, মো. শাহীনুর আলমকে কিশোরগঞ্জে, মো. মজিবুল হককে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এবং সার্ভেয়ার মো. সেলিম রেজাকে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বদলি হওয়া এই সার্ভেয়াররা দীর্ঘদিন ধরে এলএ শাখায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের চেক ছাড় করা, ওভারল্যাপিং জমি ও অতিমূল্যায়িত অবকাঠামোর বিপরীতে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। এমনকি বদলির আদেশ হওয়ার পরও দুর্নীতিবাজ চক্রটি তা ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে টাঙ্গাইলে বদলি হওয়া বিতর্কিত সার্ভেয়ার মো. মজিবুল হক ঢাকার ডিসি অফিসে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে অবৈধ উপায়ে অর্জিত কালো টাকার পাহাড় থেকে প্রায় অর্ধকোটি টাকার মিশন নিয়ে বদলি আদেশ বাতিলের তদবির চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
শুধু বদলিই নয়, দুর্নীতির এই বিশাল নেটওয়ার্কের শেকড় খুঁজতে মাঠে নামছে দুদক। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এল.এ) পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের সার্ভেয়ারদের নামে-বেনামে থাকা সম্পদের খোঁজ নিতে এবং দুর্নীতির বিস্তারিত তথ্য উদ্ঘাটন করতে এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কাজ শুরু করেছে। বিগত সময়ের বেশ কয়েকটি প্রকল্পের অনিয়মের বিষয়েও দুদকের তদন্ত চলমান রয়েছে।
