প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৭ পিএম
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের কলকাতার জীবনযাপন এবং বাংলাদেশ থেকে তার কাছে অর্থ যাওয়ার অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কলকাতার তপসিয়া এলাকায় স্ত্রীকে নিয়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে অবস্থান করছেন নানক এবং দেশে থাকা সম্পত্তি ও ব্যবসা থেকে আসা অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে তার কাছে পাঠানো হচ্ছে।
প্রতিবেদনটির দাবি, বাংলাদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থা নানকের কাছে অর্থ যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করেছে। একই সঙ্গে ভারতীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও কলকাতায় তার কাছে অর্থ যাওয়ার তথ্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ্যে আসেনি।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে নানকের কাছে প্রতি মাসে এক কোটি টাকার বেশি অর্থ পাঠানো হচ্ছে। এর একটি অংশ বরিশালে থাকা তার সম্পত্তি ও ব্যবসা থেকে এবং অন্য অংশ ঢাকার বাড়ি ও ব্যবসা থেকে আসছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরিশাল থেকে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে নগরীর সদর রোড ও কাঠপট্টি এলাকার দুই হুন্ডি ব্যবসায়ীর নাম এসেছে। তাদের একজন হোটেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং অন্যজন স্বর্ণ ব্যবসার আড়ালে হুন্ডির কারবার করেন বলে দাবি করা হয়েছে। নানকের বরিশালের বাড়ি, ভবন ও অন্যান্য সম্পত্তির ভাড়া থেকে পাওয়া অর্থ তাদের মাধ্যমে ভারতে পাঠানো হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকার অর্থ পাঠানোর পথ হিসেবে বেনাপোল সীমান্তের একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনের দাবি, ঢাকার বিভিন্ন সম্পত্তি ও ব্যবসা থেকে পাওয়া অর্থ প্রথমে যশোরের ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়। পরে পশ্চিমবঙ্গে থাকা তার এজেন্টের মাধ্যমে কলকাতায় অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়।
এ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে নানকের এক ছোট ভাই যুক্ত বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বরিশাল থেকে অর্থ পাঠানোর বিষয়টি নানকের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি দেখভাল করেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
নানকের দেশে থাকা সম্পদের মধ্যে বরিশালের বিভিন্ন এলাকার জমি ও ভবনের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বটতলা, রুপাতলী, মতাসার, সার্কুলার রোড ও করিম কুটির এলাকায় তার সম্পত্তি রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব সম্পত্তি থেকে পাওয়া ভাড়া অর্থের অন্যতম উৎস বলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করা হয়েছে।
নানক ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন গ্লোবাল ভিলেজ নামের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে প্রতিবেদনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় এবং ঢাকার বিভিন্ন বাড়ি ও ব্যবসা থেকে অর্থ দেশের বাইরে পাঠানোর অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি প্রকাশ করা হয়নি।
নানকের সম্পদ নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুদকের আবেদনের পর নানক, তার স্ত্রী সৈয়দা আরজুমান বানু এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ৫৭টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন আদালত। ওই হিসাবগুলোতে প্রায় ২ কোটি ৮৯ লাখ ৮৯ হাজার টাকা ছিল বলে আদালতে দেওয়া আবেদনে উল্লেখ করা হয়। একই আবেদনে নানক ও তার স্ত্রীর বিভিন্ন হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছিল।
এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নানক, তার স্ত্রী সৈয়দা আরজুমান বানু ও মেয়ে এস আমরীন রাখির বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুদকের অভিযোগে রাতুল টেলিকমের মাধ্যমে ২৫৯ কোটি ৬২ লাখ ৫ হাজার ১৫৮ টাকা পাচারের অভিযোগ আনা হয়। মামলায় নানকের বিরুদ্ধে স্ত্রী ও মেয়েকে অর্থ পাচারে সহযোগিতার অভিযোগও করা হয়।
ওই মামলার তদন্তের প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের মে মাসে নানক, তার স্ত্রী ও মেয়ের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল আদালত। দুদক তখন তাদের অবৈধভাবে বিপুল অর্থ ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তের কথা জানিয়েছিল।
এদিকে নানকের বিরুদ্ধে অর্থসংক্রান্ত মামলার পাশাপাশি জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও মামলা চলছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ট্রাইব্যুনাল নানকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। পরে জুন ২০২৬-এ ওই মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়।
কলকাতায় নানকের অবস্থান ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার বৈঠকে নানকের উপস্থিতির কথা জানানো হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে নানকের কাছে নিয়মিত এক কোটি টাকার বেশি অর্থ যাওয়ার অভিযোগ, অর্থের নির্দিষ্ট উৎস এবং এ অর্থ স্থানান্তরের সঙ্গে কারা জড়িত—এসব দাবির পক্ষে প্রকাশ্যে পূর্ণাঙ্গ গোয়েন্দা প্রতিবেদন বা আর্থিক নথি পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়গুলোকে সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনটিতে নানকের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার বিভিন্ন মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপেও বার্তা পাঠানো হলেও উত্তর পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে নানকের বিরুদ্ধে দেশে থাকা সম্পদ, অর্থের উৎস, অর্থ পাচার এবং বিদেশে অবস্থানকালে অর্থপ্রাপ্তি নিয়ে একাধিক অভিযোগ ও মামলা রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার নথি, আদালতের নথি এবং অর্থের লেনদেনের প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
