প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ পিএম
জাপানের মিষ্টি কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কঠিন শর্তের কথা হয়তো সংশ্লিষ্ট সবারই জানা। কিন্তু বিকল্প কোনো পথ না থাকা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অযৌক্তিক ‘ঘাড় ত্যাড়ামি’ এবং অনড় অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে যে ভয়াবহ মূল্য চোকাতে হলো, তার পরিমাণ কল্পনাতীত। স্রেফ ইগো, অদূরদর্শিতা আর হঠকারিতার কারণে ঢাকার দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়েছে পাক্কা ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা!
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৯ সালে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে এমআরটি লাইন-১ (বিমানবন্দর-কমলাপুর) এবং এমআরটি লাইন-৫ নর্দান (হেমায়েতপুর-ভাটারা) নামে দুটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। শুরুতে এই দুই প্রকল্পের সম্মিলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৯৩ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। কিন্তু দরপত্রে জাপানি ঠিকাদারদের একচেটিয়া আধিপত্য ও বাড়তি দর প্রস্তাবের কথা বলে অন্তর্বর্তী সরকার এসে প্রকল্প দুটির কাজ পুরোপুরি স্থগিত করে দেয়।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ভেবেছিল, কাজ বন্ধ রেখে তারা জাপানের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে এবং শর্ত শিথিল করতে বাধ্য করবে। কিন্তু জাইকার মতো আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সঙ্গে দরকষাকষির জন্য সরকারের হাতে কোনো 'প্ল্যান বি' বা বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে যা হওয়ার তা-ই হলো।
দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ রেখে জাপানের সঙ্গে রশি টানাটানি করার পরও কোনো লাভ হয়নি। জাইকা তাদের শর্ত থেকে এক চুলও সরেনি। উল্টো এই দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের স্থবিরতার কারণে প্রকল্পের ব্যয় জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। অবশেষে কোনো উপায় না পেয়ে নিজেদের 'ঘাড় ত্যাড়ামি' থেকে সরে এসে সেই জাপানি শর্তের কাছেই নতজানু হতে হলো ইউনূস সরকারকে।
সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় সেই জাইকার ঋণেই প্রকল্প দুটির সংশোধিত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এবার আর ৯৩ হাজার কোটিতে রক্ষা হয়নি। নতুন প্রস্তাবনায় প্রকল্প দুটির চূড়ান্ত ব্যয় গিয়ে ঠেকেছে ২ লাখ ৪ হাজার ২৪২ কোটি টাকার ওপরে। অর্থাৎ, ড. ইউনূস ও তার সরকারের ভিত্তিহীন জেদ এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে না পারার কারণে মাঝখান থেকে বাংলাদেশের ঘাড়ে অতিরিক্ত ১ লাখ ১০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকার বিশাল ঋণের বোঝা চাপল।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে জাপান বরাবরই মিষ্টি কথায় পকেট কাটে। তাদের শর্তযুক্ত বা 'টাইড লোন'-এর ফাঁদ থেকে বের হওয়া কঠিন। কিন্তু ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার পরিস্থিতি অনুধাবন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এত বড় অঙ্কের অর্থায়ন অন্য কোনো পশ্চিমা দেশ বা উন্নয়ন সহযোগী থেকে জোগাড় করার সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও তারা যে 'ঘাড় ত্যাড়ামি' দেখিয়েছে, তার মাশুল এখন দেশের সাধারণ জনগণকে দিতে হবে।
বড় মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কেবল জেদ ধরে বসে থাকলে চলে না, এর জন্য প্রয়োজন হয় বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল। ইউনূস সরকারের সেই ব্যর্থতা এবং অহেতুক কালক্ষেপণের এক জ্বলন্ত প্রমাণ এই ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার বিশাল গচ্চা, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবেই বিবেচিত হবে।
