বৃহস্পতিবার ২৪, সেপ্টেম্বর ২০২৬

বৃহস্পতিবার ২৪, সেপ্টেম্বর ২০২৬ -- : -- --

আদালতের স্থগিতাদেশ অমান্য করে নামজারি: ডেমরার এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে কোটি টাকা ঘুষের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৭ পিএম

আদালতের সুস্পষ্ট স্থগিতাদেশ ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিচারাধীন আপিল উপেক্ষা করে নামজারি (মিউটেশন) সম্পন্ন করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ঢাকা জেলার ডেমরা রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড মো. রাকিবুল ইসলামের বিরুদ্ধে। আপিল আদালত থেকে ওই নামজারি বাতিলের আদেশ এলেও তা কার্যকর করতে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কালক্ষেপণ করছেন বলে অভিযোগ করেছেন এক ভুক্তভোগী। 

এই ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মো. মাহমুদুল হাসান মুরাদ নামের এক ব্যক্তি। তাঁর দাবি, একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে প্রায় এক কোটি টাকা লেনদেনের বিনিময়ে বিতর্কিত এই নামজারি করা হয়েছে।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
লিখিত অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে ডেমরা রাজস্ব সার্কেলের নামজারি মামলা নম্বর-১২৬৯১/২৫-২৬। এই মামলার বিপরীতে গত ৪ মে আপত্তি দাখিল করেন মাহমুদুল হাসান মুরাদ। তাঁর অভিযোগ, নামজারির আবেদনকারী রাম আনন্দ মণ্ডল একজন ভারতীয় নাগরিক। ওই ব্যক্তির নাগরিকত্ব ও সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে আদালতেও একটি মামলা বিচারাধীন। আপত্তি আবেদনে এসব বিষয় উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও দলিলাদি জমা দেওয়া হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি।

ভুক্তভোগীর দাবি, একই সম্পত্তি নিয়ে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব), ঢাকার আদালতে আপিল মামলা (নম্বর-৪৩৮/২৪) চলমান ছিল। নিম্ন আদালতে এ–সংক্রান্ত কার্যক্রম স্থগিত রাখারও নির্দেশ ছিল। এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তাকে জানানো সত্ত্বেও গত ২৯ এপ্রিল ওই সম্পত্তির নামজারি সম্পন্ন করে দেওয়া হয়।

আদেশ অমান্য ও সিন্ডিকেটের দাপট
অভিযোগের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিকটি হলো বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেন। ভুক্তভোগী মাহমুদুল হাসান দাবি করেছেন, আদালতের আদেশ ও চলমান আপিল মামলার বিষয়টি উপেক্ষা করে প্রায় এক কোটি টাকার বিনিময়ে নামজারিটি সম্পন্ন করা হয়েছে। যদিও এই অর্থ লেনদেনের দাবির সপক্ষে সরাসরি কোনো প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায়নি; এটি আপাতত অভিযোগকারীর দাবি হিসেবেই রয়েছে। 

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডেমরা রাজস্ব সার্কেলে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাদের যোগসাজশে একটি কথিত ‘নামজারি সিন্ডিকেট’ গড়ে ওঠার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর আগে সরকারি জমিও ব্যক্তিমালিকানায় রূপান্তরের অভিযোগ উঠেছিল এই কার্যালয়ের বিরুদ্ধে।

বাতিল আদেশ বাস্তবায়নে গড়িমসি
গত ১৭ আগস্ট অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব), ঢাকার আপিল আদালতে বিষয়টির শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। নথিপত্র পর্যালোচনা ও শুনানি শেষে আদালত ডেমরা রাজস্ব সার্কেলের ওই বিতর্কিত নামজারিটি বাতিলের আদেশ দেন। কিন্তু আপিল আদালতের এই আদেশের এক মাস পেরিয়ে গেলেও বাস্তবে নামজারি বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি।

মাহমুদুল হাসানের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তার পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ইচ্ছাকৃতভাবে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে। আদালতের সুস্পষ্ট আদেশ থাকার পরও প্রশাসনিক এমন গড়িমসিতে তিনি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ অবস্থায় পুরো ঘটনার একটি নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত, নথিপত্র যাচাই ও দোষী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

এসিল্যান্ডের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
জানা গেছে, ৩৫তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. রাকিবুল ইসলাম ২০১৭ সালে চাকরিতে যোগ দেন। এর আগে তিনি নড়াইলে কর্মরত ছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে ডেমরা এলাকায় অবৈধ দখল উচ্ছেদে তিনি বেশ কিছু অভিযানও চালিয়েছেন। এর মধ্যে গত ৪ সেপ্টেম্বর উত্তর নন্দীপাড়া এলাকায় ২১ কোটি টাকা মূল্যের সরকারি খাসজমি উদ্ধার করে তাঁর কার্যালয়। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অনিয়ম ও আদালতের আদেশ অমান্যের অভিযোগও সামনে এল। 

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডেমরা রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রাকিবুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। স্থানীয় সাংবাদিকেরা এর আগে এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং অন্য মাধ্যম ব্যবহার করে বিষয়টি ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থ লেনদেনের অভিযোগটি যেহেতু এখনো অপ্রমাণিত, তাই পুরো বিষয়টির প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

Link copied!