শুক্রবার ২৫, সেপ্টেম্বর ২০২৬

শুক্রবার ২৫, সেপ্টেম্বর ২০২৬ -- : -- --

এসিল্যান্ড রেটিনার ‘এক খোঁচায়’ বেহাত ৫০ কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি!

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম

রাজধানীর মোহাম্মদপুর রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড তানজিলা জান্নাত রেটিনার বিরুদ্ধে একটি ‘মিসকেস’-এর মাধ্যমে প্রায় ৫০ কোটি টাকা মূল্যের সরকারি সম্পত্তি এক জালিয়াত চক্রের হাতে তুলে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সেনপাড়া পর্বতা মৌজায় হাউজিং অ্যান্ড সেটেলমেন্টের নামে অধিগ্রহণ করা সরকারি জমি থেকে ৫৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ জমি কলমের ‘এক খোঁচায়’ (রেকর্ড সংশোধনের মাধ্যমে) মোশারফ হোসেন গংদের নামে রায় দিয়েছেন তিনি। মোটা অঙ্কের ‘উপঢৌকনের’ বিনিময়ে ৩৮তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের এই কর্মকর্তা সরকারি জমি প্রভাবশালীদের ‘উপহার’ দিয়েছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি গেজেটভুক্ত এই সম্পত্তি আত্মসাৎ করতে বেশ কিছুদিন ধরেই একটি সংঘবদ্ধ চক্র মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা জাল দলিল, পর্চা, নামজারির কাগজ ও খাজনার রশিদ বানিয়ে ভূমি অফিসের কিছু অসাধু জরিপ ও রেকর্ড কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে নিজেদের নামে রেকর্ড-পর্চা তৈরি করে। এই চক্রের অন্যতম হোতা নুরুদ্দিন আহমেদ ও আবদুর রাজ্জাক। তাঁরা কেউই ওই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা নন। মূলত অব্যবহৃত সরকারি জমি আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যেই তাঁরা এই জালিয়াতির আশ্রয় নেন।

এরই ধারাবাহিকতায় নুরুদ্দিন আহমেদের ওয়ারিশ দাবিদার ছেলেমেয়েদের পক্ষে মো. মোশারফ হোসেন সেনপাড়া পর্বতা মৌজার ওই ৫৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ গেজেটভুক্ত সরকারি জমি আত্মসাতের জন্য ১৩/২০২৬ নম্বর মিসকেসটি দায়ের করেন। গত ৬ মে এসিল্যান্ড তানজিলা জান্নাত রেটিনা ওই মিসকেসের আদেশে মোশারফ গংদের পক্ষে রায় দেন। আদেশের ভেতরেই রয়েছে স্ববিরোধী তথ্য। আদেশে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন, সিএস ও এসএ দাগ দিয়ে ৯০/৬৫-৬৬ ও ৫/৭২-৭৩ নম্বর এলএ কেসের মাধ্যমে হাউজিং অ্যান্ড সেটেলমেন্টের নামে জমিটি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরও তিনি ওই জমি মোশারফ গংদের নামে নামজারির নির্দেশ দেন।

ভূমি ব্যবস্থাপনার নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো মিসকেসের রায় দিতে হলে সরেজমিন তদন্ত এবং কানুনগো বা সার্ভেয়ারের প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক। কিন্তু ১৩/২০২৬ নম্বর মিসকেসের ক্ষেত্রে এসব নিয়মের কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। এ বিষয়ে উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘উক্ত মিসকেসের উল্লিখিত জমি সরকারের অধিগ্রহণ করা—এমন মতামত দেওয়ার পরও তা ব্যক্তির নামে রায় দেওয়া হয়েছে।’

সরকারি গেজেটভুক্ত সম্পত্তি নিয়ে এসিল্যান্ডের এ ধরনের রায় দেওয়াকে সম্পূর্ণ বেআইনি বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। দেওয়ানি বিষয় বিশেষজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনির হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এসিল্যান্ড একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পদধারী। তাই তিনি সরকারের অধিগ্রহণ করা এক ইঞ্চি জমিও কোনো মিসকেস বা বিবিধ আদেশের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির নামে রায় দিতে পারেন না। শুধু আদালত থেকে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলে, তার পরিপ্রেক্ষিতে মিসকেস রুজু করে তা আপিল করতে পারেন একজন এসিল্যান্ড।’

এসিল্যান্ডের রায়ের পর আদেশের কপি পেয়ে মোশারফ গং নামজারি করার জন্য অনলাইনে আবেদন করেন। কিন্তু সম্পত্তিটি সরকারি গেজেটভুক্ত হওয়ায় সেনপাড়া পর্বতা তহশিল অফিস থেকে তার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, উক্ত মিসকেস ও নামজারি-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে মোহাম্মদপুর রাজস্ব সার্কেলের এসিল্যান্ড এবং তহশিল অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি ও দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ প্রতারক জালিয়াত চক্রের সঙ্গে ভূমি অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি জড়িত। তা না হলে সরকারি সম্পত্তির খাজনা কীভাবে নেওয়া হয়? জানা যায়, একেকটি খাজনার রশিদ কাটার জন্য জালিয়াত চক্র ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত উৎকোচ দিয়ে থাকে। মিরপুরের বর্ষীয়ান বাসিন্দা নুরুল হক জানান, বর্তমানে জালিয়াত ও ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্য অনেক বেড়েছে। তারা অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলেমিশে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার জমি আত্মসাৎ করছেন, যার মধ্যে সরকারের অধিগ্রহণকৃত গেজেটভুক্ত জমিও বাদ যাচ্ছে না।

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে মোহাম্মদপুর রাজস্ব সার্কেলের এসিল্যান্ড তানজিলা জান্নাত রেটিনার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। মুঠোফোনে কল দিলে তিনি ফোন ধরেন। তবে এ-সংক্রান্ত প্রশ্ন শোনার পরই ‘খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছি’ বলে লাইন কেটে দেন। এরপর বহুবার কল করা হলেও তিনি আর ফোন ধরেননি। 

প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা তানজিলা জান্নাত রেটিনা ঢাকা জেলার মোহাম্মদপুর রাজস্ব সার্কেলে যোগদানের পূর্বে নরসিংদী জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং বাগেরহাটের কচুয়াসহ বিভিন্ন স্থানে সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

Link copied!