প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৪ এএম
কোরবানির পশুর হাটে ১৫ লাখ টাকার ‘ছাগলকাণ্ডে’ দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কর্মকর্তা মো. মতিউর রহমানের প্রায় দেড় শ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য পেয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে মতিউরের সেই বিতর্কিত অধ্যায়কেও এবার ছাড়িয়ে গেছেন তাঁরই দীর্ঘদিনের সহকর্মী, এনবিআরের সাবেক সদস্য ড. মো. সহিদুল ইসলাম। সরকারি চাকরিজীবনে অর্জিত আয়ের সঙ্গে কোনো সংগতি না থাকলেও রাজধানী ও আশপাশে অন্তত ৫৩টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, একাধিক বহুতল ভবন, ২০টির বেশি প্লট এবং শেয়ারবাজারে বিপুল বিনিয়োগসহ চার শতাধিক কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন তিনি।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত বিভিন্ন নথিপত্র, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল ও খতিয়ান অনুযায়ী, এনবিআরের বিসিএস (শুল্ক ও আবগারি) ১৩তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা স্থাবর সম্পদের মধ্যে কেবল ফ্ল্যাটগুলোর বাজারমূল্যই ১৬২ কোটি টাকার বেশি। সব মিলিয়ে দৃশ্যমান সম্পদের মূল্যই ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা মতিউর রহমানের জ্ঞাত সম্পদের প্রায় আড়াই গুণ।
মতিউরের চেয়ে আড়াই গুণ বেশি সম্পদ
এনবিআরের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রেসিডেন্ট মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধানে প্রায় দেড় শ কোটি টাকার সম্পদের প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছিল। মতিউরের সেই বিপুল সম্পদ নিয়েই দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল।
কিন্তু এনবিআরের একই ব্যাচের কর্মকর্তা ড. মো. সহিদুল ইসলামের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, সম্পদের অঙ্কে তিনি মতিউরকেও অনেক পেছনে ফেলেছেন। সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা ও অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, সহিদুল ইসলামের দৃশ্যমান ও দলিলভুক্ত সম্পদের পরিমাণই চার শ কোটি টাকার বেশি। এছাড়া আরও শতকোটি টাকার বেনামি সম্পত্তি রয়েছে কি না, তা নিয়ে জোর অনুসন্ধান চলছে।
বসুন্ধরায় শতকোটির ভবন, ৫৩টি ফ্ল্যাট
সহিদুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির সম্পদের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু রাজধানীর অভিজাত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ‘জি’ ব্লকে অবস্থিত ১০ তলা একটি নিজস্ব ভবন, যার নাম ‘শেল কবিতা’। পুরো ভবনে আড়াই হাজার বর্গফুটের মোট ২০টি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার সব কটির মালিক এই দম্পতি। স্থানীয় আবাসন খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল এই ভবনের ফ্ল্যাট ও জমির বাজারদরই ১০০ কোটি টাকার বেশি।
বসুন্ধরার বাইরে রাজধানীতে সহিদুল, তাঁর স্ত্রী ও আত্মীয়দের নামে আরও ৩৩টি ফ্ল্যাটের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলামোটরের স্বজন টাওয়ারে দুটি ফ্ল্যাট (মূল্য ৪ কোটি টাকা), মিরপুর রূপনগর আরামবাগে স্ত্রীর নামে ছয়তলা ভবনের ১০টি ফ্ল্যাট (মূল্য ৩০ কোটি টাকা), ইস্কাটনের গার্ডেনিয়া টাওয়ারে একটি ফ্ল্যাট (মূল্য ৪ কোটি টাকা) এবং মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিংয়ের দ্বিতীয় প্রকল্পে ২০টি ফ্ল্যাটের একটি ছয়তলা ভবন (মূল্য ২০ কোটি টাকা)। এছাড়া ইস্টার্ন হাউজিং ও গাবতলী বেড়িবাঁধ এলাকায় কারখানা ও গুদাম হিসেবে ভাড়া দেওয়া প্রায় ৫০ কোটি টাকা মূল্যের জমি রয়েছে তাঁদের নিয়ন্ত্রণে।
সাভারে আলিশান বাংলো ও ৩২০ কাঠা জমি
মতিউর রহমানের মতো ঢাকার উপকণ্ঠে রিসোর্ট না করলেও সাভারের মধুমতি মডেল টাউনে বিপুল জমি কিনে রেখেছেন সহিদুল। সেখানে ৩৫ কাঠা জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে লাল ইটের বিলাসবহুল বাংলোবাড়ি ‘সেঁজুতি’। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলোর কেবল জমির দামই অন্তত ১০ কোটি টাকা।
এছাড়া মধুমতি আবাসিক প্রকল্পে সহিদুলের আরও পাঁচটি বড় দাগে জমি রয়েছে, যার মোট পরিমাণ ৩২০ কাঠা। প্রকল্পটিতে গবাদিপশুর খামার, ওয়ার্কশপ ও গ্যারেজ হিসেবে ভাড়া দেওয়া এসব প্লটের বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত ৯০ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প এবং গাজীপুরের কালীগঞ্জে এই দম্পতির নামে আরও সাতটি প্লটে কোটি কোটি টাকার জমি রয়েছে।
পুঁজিবাজারে ৮০ কোটি, ছেলের ব্যবসায় পিতার পুঁজি
সহিদুল ইসলামের স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির নামে পুঁজিবাজারে একটি বিও অ্যাকাউন্টে প্রায় ৮০ কোটি টাকার শেয়ার পোর্টফোলিও রয়েছে। পাশাপাশি সোনালী ব্যাংকের একটি হিসাবে পাওয়া গেছে ৫৫ লাখ টাকার নগদ স্থিতি।
অন্যদিকে সরকারি চাকরির অর্থ দিয়ে ছেলে হাসিন ফারহানের নামে বসুন্ধরার বাণিজ্যিক টাওয়ারে খোলা হয়েছে একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ফারহানের মালিকানাধীন ‘ভেলোসিটি গ্রুপ’-এর অধীনস্থ স্থাপত্য ও বিপণন প্রতিষ্ঠানে পিতা সহিদুল ইসলাম অন্তত পাঁচ কোটি টাকা প্রাথমিক পুঁজি হিসেবে জোগান দিয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
পদে থেকে প্রভাব ও আয়ের আকাশ-পাতাল ব্যবধান
কর্মজীবনে ড. মো. সহিদুল ইসলাম জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও নীতি নির্ধারণী পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি এনবিআরের শুল্ক ও আবগারি বিভাগের সদস্য, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) মহাপরিচালক (ডিজি), কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য এবং কাস্টমস কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১০ সালের পর এসব লোভনীয় পদে থাকার সময় বিভিন্ন বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে শুল্ক রেয়াত সুবিধা দেওয়া এবং প্রভাব খাটিয়ে তিনি এই অর্থবিত্ত গড়ে তোলেন।
অথচ একজন সরকারি কর্মকর্তার গ্রেড-১ অনুযায়ী ৩০ থেকে ৩২ বছরের চাকরিজীবনে সব মিলিয়ে মোট বৈধ বেতন-ভাতা হতে পারে বড়জোর দেড় থেকে দুই কোটি টাকা। পেনশন ও সঞ্চয়পত্র মিলিয়ে যা কোনোভাবেই তিন কোটি টাকা ছাড়ানোর কথা নয়। কিন্তু সহিদুল ইসলামের অর্জিত সম্পদের পরিমাণ তাঁর সারা জীবনের মোট বৈধ আয়ের তুলনায় অন্তত এক শ গুণেরও বেশি।
দুদকের অনুসন্ধানের প্রস্তুতি ও আত্মগোপনের তথ্য
মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর এবার সহিদুল ইসলামের শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদের খোঁজে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদক সূত্রে জানা গেছে, সহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট নথি কমিশনের নজরে এসেছে এবং এ বিষয়ে শিগগিরই আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান দল গঠন করা হচ্ছে।
এদিকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও দুদকের সম্ভাব্য তৎপরতা আঁচ করতে পেরে সহিদুল ইসলাম স্ত্রীসহ গোপনে দেশ ছেড়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন বলে একটি দায়িত্বশীল সূত্র দাবি করেছে। তাঁর অবর্তমানে দেশে থাকা জমি ও বহুতল ভবনগুলো নিকটাত্মীয়দের মাধ্যমে দেখভাল করা হচ্ছে। বক্তব্য জানার জন্য তাঁর ব্যবহৃত ব্যক্তিগত নম্বরগুলোতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মতিউর রহমান কিংবা সহিদুল ইসলাম—কারও পক্ষেই সরকারি চাকরির বৈধ আয়ে শত শত কোটি টাকার সম্পদ বানানো সম্ভব নয়। রাজস্ব প্রশাসনের মতো সংবেদনশীল জায়গায় এমন শীর্ষ কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এমন সম্পদের পাহাড় গড়লেন, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। শুধু এনবিআর থেকে পদ সরানো যথেষ্ট নয়, অবিলম্বে এসব সম্পদ ক্রোক করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
