শুক্রবার ২৫, সেপ্টেম্বর ২০২৬

শুক্রবার ২৫, সেপ্টেম্বর ২০২৬ -- : -- --

‘নিউজ’ করার ভয় দেখিয়ে সরকারি কর্মকর্তাকে ব্ল্যাকমেল, ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২১ পিএম

নারী সাংবাদিক জান্নাতুল ফেরদৌস

সরকারি কর্মকর্তাদের মুঠোফোনে খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠিয়ে ‘নিউজ’ করার ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) এক উপপরিচালক দীর্ঘ তিন মাস ধরে এমন ব্ল্যাকমেলের শিকার হচ্ছেন। চক্রটি শুধু হোয়াটসঅ্যাপে হুমকি দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, ওই কর্মকর্তার গতিবিধি নজরদারি করে সরাসরি তাঁর কার্যালয়ে আসার হুমকিও দিচ্ছে।

ভুক্তভোগী কর্মকর্তার অভিযোগ, নিজেকে ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’–এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদক দাবি করে এবং চক্রটির মূলহোতা জান্নাতুল ফেরদৌস নামের এক নারী তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে (+৮৮০১৬৪৩৮০০১২৮) বার্তা পাঠাচ্ছেন। সংবাদ প্রকাশ বন্ধ রাখার বিনিময়ে একটি গোপন বৈঠকে ওই নারী ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। তিনি ভুক্তভোগীকে জানান, তাঁর পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন জিটু ১০ লাখ টাকার নিচে কোনো বিষয়ে ‘আপস’ করেন না। মূলত সম্পাদকের নাম ভাঙিয়েই এই টাকা দাবি করা হচ্ছে। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই পত্রিকায় জান্নাতুল ফেরদৌস নামে কোনো প্রতিবেদক নেই।

সম্প্রতি চাঁদাবাজ চক্রটি নতুন কৌশল নিয়েছে। তারা ভুক্তভোগী কর্মকর্তার গতিবিধির ওপর নজর রাখছে। ওই হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে সম্প্রতি পাঠানো এক বার্তায় লেখা হয়েছে, ‘আমি বিএমইটিতে এসেছিলাম সাক্ষাতের জন্য। ভাই তো মনে হয় এখন বিএমইটি ভবনে বসেন না, শান্তিনগরে অফিসে বসেন। আপনার সাক্ষাতের জন্য আমি কাল আসব কি না।’ এই বার্তার মাধ্যমে সরাসরি উপস্থিত হয়ে মানসিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা।

এর আগে পাঠানো একাধিক বার্তায় মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির চেষ্টা করে চক্রটি। একটি বার্তায় লেখা হয়, ‘আপনি তো এক পত্রিকার সাংবাদিক দিয়ে আমাকে ফোন করিয়েছেন নেগোসিয়েশনের (সমঝোতা) জন্য। এ বিষয়টি একটু অন্য রকম হয়ে গেল না?’ 

আরেক বার্তায় বলা হয়, ‘অনেক দিন হয়ে গেল, আপনার সাক্ষাৎ পাইনি। আমরা প্রতিবেদন প্রকাশ করতে যাচ্ছি।’ পাশাপাশি হুমকি দিয়ে বলা হয়, ‘আপনার পাঠানো শাহ আলম নামের এক রিপোর্টার আমাকে ডিস্টার্ব করলে বিষয়টি হাইলাইট করে নিউজ হবে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পেশাদার সাংবাদিকতার মোড়কে কর্মকর্তাদের সম্মানহানির ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায়ই এই চক্রের মূল উদ্দেশ্য। চক্রটি প্রথমে হোয়াটসঅ্যাপে একটি ভিজিটিং কার্ড পাঠায়। এরপর লেখে, ‘আপনার বিরুদ্ধে কিছু তথ্য আছে, যা নিয়ে নিউজ করতে যাচ্ছি। তাই কথা বলা দরকার।’ পরে লেখা হয়, ‘যে তথ্যগুলো নিয়ে নিউজ করতে যাচ্ছি, তার প্রমাণ মোটামুটি পেয়েছি।’ 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, সামাজিক সম্মান ও পেশাগত ঝামেলার ভয়ে অনেক সময় কর্মকর্তারা প্রতিবাদ না করে চক্রটির সঙ্গে টাকা দিয়ে রফা করতে বাধ্য হন। আর এই সুযোগটিই নিচ্ছে অপরাধীরা।

তিন মাস ধরে এই হয়রানির শিকার বিএমইটির ওই উপপরিচালক বলেন, ‘আমি কোনো অন্যায় করিনি। অথচ অপরিচিত নম্বর থেকে সাংবাদিক পরিচয়ে ভয় দেখানো হচ্ছে। এখন তারা আমার গতিবিধিও নজরে রাখছে, যা চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণ।’ তিনি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও চক্রটিকে ধরতে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল মাধ্যমে এ ধরনের ব্ল্যাকমেল বা চাঁদাবাজি দণ্ডনীয় অপরাধ। ভুঁইফোড় বা অখ্যাত সংবাদপত্রের নাম ভাঙিয়ে একশ্রেণির অপরাধী প্রশাসনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। এ ধরনের ঘটনায় ভয় না পেয়ে প্রমাণসহ সরাসরি নিকটস্থ থানায় বা সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ব্যবহার করে চক্রটিকে শনাক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

Link copied!