শুক্রবার ২৫, সেপ্টেম্বর ২০২৬

শুক্রবার ২৫, সেপ্টেম্বর ২০২৬ -- : -- --

ফকির থেকে রাতারাতি কোটিপতি: কালীগঞ্জে বেপরোয়া ভূমিদস্যু বিএনপি নেতা বাবলু!

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৭ পিএম

যেন হাতে পেয়েছেন জাদুর প্রদীপ! একসময়ের সাধারণ অবস্থা থেকে রাতারাতি ফুলেফেঁপে কোটিপতি বনে গেছেন গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব খালেকুজ্জামান বাবলু এবং তার দুই ভাই—আনিসুর রহমান রিপন ও সোহেল। স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব খাটিয়ে এই ত্রিমূর্তি পুরো কালীগঞ্জে কায়েম করেছেন একচ্ছত্র ত্রাসের রাজত্ব। নিরীহ মানুষের জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ, জুয়ার আখড়া বসানো থেকে শুরু করে অবৈধভাবে বালু দিয়ে কৃষিজমি গিলে খাওয়ার মতো কোনো জঘন্য অপকর্মই বাদ রাখছেন না তারা। তাদের পেটোয়া বাহিনীর ভয়ে তটস্থ গোটা এলাকার মানুষ; কেউ মুখ খুললেই নেমে আসে নগ্ন হামলা ও মিথ্যা মামলার খড়গ। 

প্রেসক্লাবের সামনে ভুক্তভোগীদের কান্না ও ভূমিদস্যুতা:
গত ২৯ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে বাবলু ও তার ভাইদের এই মাফিয়া রাজত্বের বিরুদ্ধে নিজেদের নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। সেখানে উঠে আসে তাদের লোমহর্ষক ভূমিদস্যুতার চিত্র। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দুবাইপ্রবাসী আলমগীর কবিরের প্রায় চার বিঘা জমি গায়ের জোরে দখল করেছে বাবলু সিন্ডিকেট। এছাড়া মাদক কারবারের প্রতিবাদ করায় বায়েজিদ হাসান শিবলী নামের এক যুবককে মারধর করে উল্টো মাদকের মিথ্যা মামলা দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করার মতো ঘৃণ্য চক্রান্তের নেপথ্য কারিগরও এই বাবলু। জিয়ারুল, মিন্টু মোল্লা, সজল শেখ, মাহফুজ ও লতিফ মোল্লাদের নিয়ে বাবলু গড়ে তুলেছেন এক দুর্ধর্ষ সিন্ডিকেট, যাদের কাজই হলো সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফায়দা লোটা। 

বিলাসবহুল প্রাডো গাড়ি ও মাদকের গডফাদার:
কালীগঞ্জের বাতাসে এখন বাবলুর নাম ভাসছে 'মাদকের গডফাদার' হিসেবে। অল্প সময়ে গড়ে তুলেছেন রাজপ্রাসাদসদৃশ বাড়ি, ক্ষমতার দম্ভে হাঁকিয়ে চলছেন বিলাসবহুল প্রাডো গাড়ি। তার এই মাদক নেটওয়ার্কের থাবা কত দূর বিস্তৃত, তা সম্প্রতি তার আপন ভাগনে মিন্টুর ৩,০০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের ঘটনাতেই স্পষ্ট। ভাগনেকে সামনে রেখে মামা বাবলু কালীগঞ্জে মাদকের যে বিষবাষ্প ছড়াচ্ছেন, তাতে ধ্বংস হচ্ছে এলাকার যুবসমাজ। সম্প্রতি শ্রীপুরের পাগলা ব্রিজে বাবলুর সেই প্রাডো গাড়িতে দুর্বৃত্তদের হামলার ঘটনাও তার অন্ধকার জগতের হিস্যা নিয়ে দ্বন্দ্বের ফসল বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

চরিত্রের দ্বৈত রূপ ও রাজনৈতিক ভণ্ডামি:
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো খালেকুজ্জামান বাবলুর চরম রাজনৈতিক ভণ্ডামি। দিনের বেলায় বিএনপির ত্যাগী নেতা সেজে দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মঞ্চ কাঁপাচ্ছেন, আর রাতের আঁধারে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে গোপন আঁতাত করে নিজের অবৈধ সম্পদের পাহাড় পাহারা দিচ্ছেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী রং বদলানো এই নেতার খুঁটির জোর নিয়ে খোদ দলের ভেতরেই ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। 

অপকর্ম ঢাকতে 'নাটক' আখ্যা:
দুর্নীতির টাকায় রাতারাতি গড়ে তোলা রাজপ্রাসাদ ও প্রাডো গাড়ির অর্থের উৎস কোথায়—এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তাদের কাছে নেই। উল্টো ভুক্তভোগীদের কান্নাকে 'বানোয়াট, সাজানো ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নাটক' আখ্যা দিয়ে গত ২৯ আগস্ট একটি পাল্টা বিবৃতি দিয়েছে কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপি। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পদবি ও দলীয় প্যাড ব্যবহার করে নিজেদের অপকর্ম ধামাচাপা দেওয়ার এক নির্লজ্জ চেষ্টা চালাচ্ছেন বাবলু।

ভুক্তভোগী ও কালীগঞ্জের সাধারণ মানুষের এখন একটাই দাবি—এই 'নব্য কোটিপতি' মাফিয়া পরিবারের সম্পদের হিসাবসহ তাদের সমস্ত অপকর্মের অবিলম্বে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে গজিয়ে ওঠা এই পরগাছাদের উপড়ে না ফেললে এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে দলের এবং সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হবে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—আর কতকাল এই মাফিয়াদের কাছে জিম্মি থাকবে কালীগঞ্জ?

Link copied!