রবিবার ০৮, নভেম্বর ২০২৬

রবিবার ০৮, নভেম্বর ২০২৬ -- : -- --

মর্টগেজে ফ্ল্যাট নিতে চান? যেসব সতর্কতা জরুরি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম

প্রশ্ন: আমি ঢাকায় এককালীন কিছু টাকা অগ্রিম দিয়ে একটি ফ্ল্যাট ‘মর্টগেজ’ (মাসিক ভাড়া ছাড়া) নেওয়ার কথা ভাবছি। মেয়াদ শেষে মালিক পুরো টাকা ফেরত দেবেন। এ ধরনের চুক্তিতে কী কী আইনি ঝুঁকি থাকে এবং ভবিষ্যতে কোনো জটিলতা এড়াতে আমার কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?  
— এক পাঠক, ঢাকা

পরামর্শ:  
আমাদের দেশে বিশেষ করে ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে বর্তমানে এককালীন বড় অঙ্কের টাকা মালিককে দিয়ে নির্দিষ্ট মেয়াদে কোনো মাসিক ভাড়া ছাড়া ফ্ল্যাটে বসবাস করার বিষয়টি ‘মর্টগেজ’ হিসেবে বেশ প্রচলিত। আপাতদৃষ্টিতে এটি লাভজনক মনে হলেও সঠিক আইনি সুরক্ষা না থাকলে এটি চরম আর্থিক ক্ষতি ও আইনি ভোগান্তির কারণ হতে পারে।

আপনি যদি এমন কোনো ফ্ল্যাট মর্টগেজে নিতে চান, তবে চূড়ান্ত চুক্তি করার আগে নিচের আইনি বিষয়গুলো নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি:

১. মালিকানা ও নথিপত্র যাচাই:  
যিনি ফ্ল্যাট দিচ্ছেন, তিনি ফ্ল্যাটের প্রকৃত মালিক কি না—তা শতভাগ নিশ্চিত হতে হবে। এর জন্য ফ্ল্যাটের মূল রেজিস্ট্রি দলিল, পূর্ববর্তী বায়া দলিল, নামজারি (মিউটেশন) খতিয়ান ও হালনাগাদ খাজনার রসিদ দেখে নিন। ডেভেলপার কোম্পানির কাছ থেকে কেনা ফ্ল্যাট হলে তাদের হস্তান্তরপত্র (Allotment Letter বা Handover Letter) ও পজেশন লেটার যাচাই করুন।

২. ফ্ল্যাটটি ব্যাংকে দায়বদ্ধ কি না:  
এ ধরনের চুক্তিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ফ্ল্যাটটি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বন্ধক রাখা আছে কি না। অনেক সময় মালিকেরা ব্যাংক ঋণ খেলাপির মুখে পড়ে গোপনে সাধারণ মানুষের কাছে মর্টগেজে দিয়ে টাকা নেন। পরবর্তী সময়ে ব্যাংক ফ্ল্যাটটি নিলাম বা ক্রোক করলে আপনি উচ্ছেদ হতে পারেন এবং জমার টাকাও আটকে যেতে পারে। তাই ফ্ল্যাটটি সম্পূর্ণ দায়মুক্ত কি না, তা সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে ‘নির্দায় সনদ’ (Non-Encumbrance Certificate - NEC) যাচাই করে জেনে নেওয়া নিরাপদ।

৩. আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা:  
টাকার অঙ্কের ক্ষেত্রে কোনো অবস্থাতেই নগদে (Cash) লেনদেন করবেন না। পুরো অর্থ ব্যাংক ট্রান্সফার, অ্যাকাউন্ট পেয়ি চেক অথবা পে-অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে, যাতে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ হস্তান্তরের অকাট্য আইনি প্রমাণ সংরক্ষিত থাকে।

৪. জামানত হিসেবে ব্যাংক চেক গ্রহণ:  
আপনি যে পরিমাণ অর্থ মালিককে দিচ্ছেন, তার নিরাপত্তার স্বার্থে মালিকের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সমপরিমাণ টাকার একটি স্বাক্ষরিত চেক (Security Cheque) গ্রহণ করুন। চুক্তিনামায় ওই চেকের নম্বর, ব্যাংকের নাম ও বিবরণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। মেয়াদ শেষে টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে এই চেকের মাধ্যমে ‘নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট’ (NI Act)-এর ১৩৮ ধারায় মামলা করে অর্থ উদ্ধারের আইনি সুযোগ থাকে।

৫. সুনির্দিষ্ট চুক্তিপত্র সম্পাদন:  
ন্যূনতম ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে বিশদ শর্ত উল্লেখ করে চুক্তিপত্র তৈরি করতে হবে এবং তা নোটারি পাবলিক বা সম্ভব হলে সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে রেজিস্ট্রি করে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ। চুক্তিতে স্পষ্ট থাকতে হবে:  
ক. মোট টাকার পরিমাণ এবং পরিশোধের ব্যাংকিং মাধ্যম।  
খ. চুক্তির সঠিক মেয়াদ (যেমন: ২ বছর বা ৩ বছর)।  
গ. মেয়াদ শেষ হওয়ার কত দিনের মধ্যে মালিক কীভাবে টাকা ফেরত দেবেন।  
ঘ. মেয়াদ শেষে টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে আপনি টাকা ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত ফ্ল্যাটে বসবাস চালিয়ে যাওয়ার অধিকার রাখবেন কি না, কিংবা ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে টাকা তুলে নেওয়ার শর্ত থাকবে কি না।

৬. ফ্ল্যাট মালিক সমিতিকে অবহিত করা:  
ভবনের ‘ফ্ল্যাট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’ বা কল্যাণ সমিতিকে চুক্তিপত্র দেখিয়ে বিষয়টি লিখিতভাবে অবহিত করুন। কোনো কোনো ভবনে এ ধরনের চুক্তির জন্য সমিতির অনুমোদন বা রেকর্ডের প্রয়োজন হয়, যা ভবিষ্যতে তৃতীয় পক্ষের দাবি বা জটিলতা এড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

সবশেষে পরামর্শ থাকবে—মৌখিক কোনো আশ্বাসে বিশ্বাস না করে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে ফ্ল্যাটের কাগজপত্র যাচাই করিয়ে তবেই চূড়ান্ত চুক্তি ও অর্থ লেনদেন করুন।

মাহিয়া বিনতে মাহবুব
সদস্য, ঢাকা আইনজীবী সমিতি (ঢাকা বার)
আইনজীবী, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত

Link copied!