প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২৪ পিএম
একসময় যেখানে ছিল বর্জ্যের বিশাল পাহাড়, সহ্য করা কঠিন দুর্গন্ধ আর মারাত্মক পরিবেশদূষণ—আজ সেখানে শোভা পাচ্ছে হাজারো সবুজ গাছপালা ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদ। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজার থেকে হেমায়েতপুর পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন বাগান ‘রূপান্তর’। দীর্ঘ দুই দশকের ময়লার ভাগাড়কে সবুজে বদলে দেওয়ার এই উদ্যোগকে দেশের অন্য সব জেলার প্রশাসকদের জন্য এক অনন্য অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে এই সাফল্যের জন্য তিনি ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ধন্যবাদ জানান।
রবিবার (১৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১১টায় আমিনবাজারে নিমগাছ রোপণের মাধ্যমে ‘রূপান্তর’ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা থাকলে একটি এলাকাকে মানুষের কল্যাণে কীভাবে সুন্দরভাবে পরিবর্তন করা যায়, আমিনবাজারের এই উদ্যোগ তার বড় প্রমাণ। আপনারা যারা এলাকাবাসী, তারা জানেন দুই মাস আগে এই জায়গাটার কী অবস্থা ছিল। আর আজকে মাত্র দুই মাস পরে এই জায়গাটির কী দারুণ পরিবর্তন হয়েছে! এই চার কিলোমিটার এলাকার মানুষের কাছে জায়গাটি দেখতে ভালো লাগার পাশাপাশি ভালো পরিবেশে শ্বাস নেওয়াও এখন সহজ হয়েছে।"
বক্তব্যে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বাগানের সৌন্দর্য ধরে রাখার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "সরকার উদ্যোগ নিয়ে এলাকাটিকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলেছে। এখন এই সৌন্দর্য ধরে রাখার দায়িত্ব স্থানীয় জনগণকেও নিতে হবে। জনগণ সরকারকে সহযোগিতা করলে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে সমাধান করা সম্ভব হবে।"
আমিনবাজারের এই সবুজ উদ্যোগকে মহাসড়কের চার কিলোমিটার এলাকার বাইরেও বিস্তৃত করার জন্য ঢাকা জেলা প্রশাসককে পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি মহাসড়কের দুই পাশে থাকা মিল-কারখানার মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে পাশের ফাঁকা জায়গাগুলো ভাগ করে পরিচর্যার দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্যদেরও জেলা প্রশাসনকে সহযোগিতা করার অনুরোধ করেন, যাতে বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান করে অঞ্চলটিকে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব করে তোলা যায়।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সময় উঠে আসে প্রকল্পের পেছনের গল্পও। জানা যায়, প্রায় দুই দশক ধরে আমিনবাজার এলাকায় মহাসড়কের পাশে ময়লা-আবর্জনা ফেলে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু স্তূপ তৈরি করা হয়েছিল। গত জুলাই মাসে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে সেনাবাহিনীর বর্ষাকালীন মহড়া পরিদর্শনে যাওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রী এই বর্জ্যের ভাগাড় ও দুর্গন্ধ প্রত্যক্ষ করেন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
এরপর ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সাভার উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার সহযোগিতায় ৩ মাসের নিরলস প্রচেষ্টায় জমি থেকে জমে থাকা বিপুল বর্জ্য অপসারণ করা হয়। 'রূপান্তর' প্রকল্পের মূল আকর্ষণ ও বৈশিষ্ট্য:
বর্জ্য অপসারণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন: বর্জ্য সরানোর পর জমি প্রস্তুত, মাটির সুরক্ষায় প্যালাসাইডিং, পানি নিষ্কাশনের জন্য ২০টি সারফেস ড্রেন এবং একটি সার্ভিস শেড নির্মাণ করা হয়েছে।
মাটি ও সবুজ সুরক্ষা: মাটির ক্ষয়রোধে নেপিয়ার, দুর্বা ও বিন্নাসহ বিভিন্ন জাতের ঘাস লাগানো হয়েছে।
বৃক্ষরোপণ: প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১০ থেকে ২৫ মিটার চওড়া এই বাগানে ১,০৫০টি নিমগাছ, ৩,৮১৫টি সুপারি, ৬০টি তালগাছ, ৬৫০টি মাধবীলতা, ৪৫টি সিজিয়াম, ৭০০টি রঞ্জনসহ মোট ৬,৫৮৫টি দেশি গাছ ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদ রোপণ করা হয়েছে।
নবায়নযোগ্য শক্তি ও আলোকসজ্জা: পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর অংশ হিসেবে ২ কিলোওয়াট সোলার প্যানেল ও ১ কিলোওয়াট উইন্ড টারবাইনের মাধ্যমে ৩ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাতের আলোকসজ্জার জন্য পুরো এলাকায় ১২০টি বৈদ্যুতিক বাতি স্থাপন করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের দুর্গন্ধময় বর্জ্যস্তূপ সরিয়ে এমন দৃষ্টিনন্দন রূপ দেওয়ায় রাজধানী ঢাকার অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ আমিনবাজার এলাকাটি এখন সম্পূর্ণরূপে দূষণমুক্ত ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপশি যাতায়াতকারী হাজারো মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত করছে।
