প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোকে (বিএমইটি) ক্ষমতার আখড়ায় পরিণত করে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (কর্মসংস্থান) ও সাবেক পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মাসুদ রানার বিরুদ্ধে। পদোন্নতি জালিয়াতি, বদলি বাণিজ্য এবং ভুয়া ভিসায় বহির্গমন ছাড়পত্র দেওয়ার মাধ্যমে এই বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
জাতীয় দৈনিকে তাঁর এই অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে আসার পর সচিবালয়ের উচ্চপর্যায় থেকে মাসুদ রানার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ও বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ উঠেছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে বরখাস্ত বা তদন্তের মুখোমুখি করার বদলে উল্টো বিএমইটির বর্তমান মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) জামিল আহমেদ তাঁর পক্ষে সাফাই গেয়ে তাঁকে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন।
অন্যদিকে, প্রবাসীদের স্বার্থরক্ষা ও জনশক্তি খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ মোখতার আহমেদসহ শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বিষয়টি জানা সত্ত্বেও নীরব ভূমিকা পালন করছেন। প্রশাসনিক প্রধানদের এমন নিশ্চুপ ভূমিকা ও পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে বিএমইটির বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
পরিসংখ্যান কর্মকর্তা থেকে ক্ষমতার শীর্ষে
বিএমইটির নথিপত্র ও অনুসন্ধানে জানা যায়, মাসুদ রানা মূলত একজন সাধারণ পরিসংখ্যান কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেন। জ্যেষ্ঠ সহকর্মীদের নিয়মবহির্ভূতভাবে ডিঙিয়ে এবং রাজনৈতিক প্রভাব ও মন্ত্রণালয়ের একাংশকে প্রভাবিত করে তিনি বিএমইটির প্রভাবশালী পদ ‘পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ)’ হিসেবে আসীন হন।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতির সর্বময় ক্ষমতা নিজের হাতে নেওয়ার পর তাঁর দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে প্রশাসনিক তোলপাড়ের মুখে তাঁকে স্রেফ পরিচালক (কর্মসংস্থান) পদে রদবদল করা হয়। তবে পদ বদলালেও বিএমইটিতে তাঁর গড়ে তোলা সিন্ডিকেট এখনো সমানভাবে সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
দেশে-বিদেশে সুবিশাল সম্পদের পাহাড়
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থায় জমা দেওয়া সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগে মাসুদ রানা ও তাঁর স্ত্রী উম্মে ছালমা শেখের বিপুল সম্পদের প্রাথমিক বিবরণ উঠে এসেছে:
- রাজধানীতে ফ্ল্যাট ও বহুতল ভবন: রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, ধানমন্ডি, নিকেতন এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় মাসুদ রানা ও তাঁর স্ত্রীর নামে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। এ ছাড়া উত্তরার প্রাণকেন্দ্রে দুটি বহুতল আবাসিক ভবন এবং সাভারে শত শত শতাংশ জমি রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
- গ্রামে দৃষ্টিনন্দন বাড়ি: নিজ জেলা নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ উপজেলার চানপুর গ্রামে শত শত শতাংশ জমির ওপর কোটি কোটি টাকার বিদেশি মার্বেল পাথর ব্যবহার করে একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন তিনি।
- মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’: হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার করে ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম’ (MM2H) প্রকল্পের আওতায় অঢেল সম্পদ গড়ে তোলার তথ্য মিলছে।
- দবাইয়ে ব্যবসা ও সম্পত্তি: সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে অংশীদারত্বে বহুতল ভিলা ক্রয় এবং সরাসরি স্বর্ণ ও জনশক্তি খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগ রয়েছে।
টিটিসি অধ্যক্ষদের জিম্মি ও ফাইলে কমিশন
বিএমইটির প্রশাসনিক পদে থাকাকালে সারাদেশের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর (টিটিসির) অধ্যক্ষদের ঢাকায় ডেকে নিজ দপ্তরে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে পছন্দসই পদে পদায়ন, কেনাকাটা ও ফাইল অনুমোদনের বদলে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। অনৈতিক লেনদেনে রাজি না হলে তাঁদের দুর্গম এলাকায় বদলির হুমকি দেওয়া হতো।
এ ছাড়া রিক্রুটিং এজেন্সির নতুন লাইসেন্স দেওয়া, তদন্ত রিপোর্ট এবং বহির্গমন ছাড়পত্রের ফাইলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কমিশন দাবি করা হতো বলে জানা গেছে। নিজের ভাইয়ের নামে নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সির আড়ালেও তিনি সরকারি সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার করেছেন।
দুদক ও গোয়েন্দা সংস্থায় ৪ দফা দাবি
মাসুদ রানার দুর্নীতির তদন্ত ও অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে দুদক, বিএফআইইউ, এনবিআর, সিআইডি এবং এনএসআইয়ের কাছে চার দফা দাবি পেশ করেছেন সংক্ষুব্ধ নাগরিকরা:
১. মাসুদ রানা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করা এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা।
২. হুন্ডির মাধ্যমে মালয়েশিয়া ও দুবাইয়ে পাচার করা অর্থের উৎস উদ্ঘাটন করে সেসব ব্যাংক হিসাব বন্ধ করা।
৩. তিনি যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে বা আলামত নষ্ট করতে না পারেন, সেজন্য বিদেশ গমনে তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা।
৪. মানিলন্ডারিং ও দুদক আইনের আওতায় মামলা করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
অভিযোগ বিষয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিএমইটি একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান যা প্রবাসীদের সেবায় নিয়োজিত। সেখানে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য এলেও যদি প্রশাসনিক প্রধানরা তাঁকে আশ্রয় দেন, তবে পুরো অভিবাসন খাতেই শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে।
তাঁদের মতে, অনতিবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযুক্ত মাসুদ রানাকে সাময়িক বরখাস্ত করা এবং বিএমইটির মহাপরিচালকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
