শনিবার ০৮, আগস্ট ২০২৬

শনিবার ০৮, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --

বিএমইটির ‘দুর্নীতির সুলতান’ মাসুদ রানা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম

বিএমইটির ‘দুর্নীতির সুলতান’ মাসুদ রানা

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোকে (বিএমইটি) নিজের ক্ষমতার আখড়া বানিয়ে দুর্নীতির এক অঘোষিত সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) এবং বর্তমান পরিচালক (কর্মসংস্থান) মো. মাসুদ রানা। প্রবাসগামী অসহায় কর্মীদের রক্ত পানি করা উপার্জনে ভাগ বসিয়ে, পদোন্নতি জালিয়াতি, বদলি বাণিজ্য এবং ভুয়া ভিসায় বহির্গমন ছাড়পত্র প্রদানের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে তিনি গড়ে তুলেছেন প্রায় হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়।

প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে চালানো এসব নজিরবিহীন অনিয়ম, ঘুষ-দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং অর্জিত অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শরণাপন্ন হয়েছেন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংক্ষুব্ধ নাগরিকরা। সম্প্রতি দুদক চেয়ারম্যান বরাবর পেশ করা এক সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগে মাসুদ রানা ও তাঁর পরিবারের গড়ে তোলা এই প্রকাণ্ড সাম্রাজ্যের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগের অনুলিপি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সিআইডি এবং এনএসআইসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের সংস্থাগুলোতে পাঠানো হয়েছে।

পরিসংখ্যান কর্মকর্তা থেকে দুর্নীতির ‘একচ্ছত্র অধিপতি’

বিএমইটি সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মাসুদ রানা মূলত একজন সাধারণ পরিসংখ্যান কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক জালিয়াতি এবং জ্যেষ্ঠ সহকর্মীদের নিয়মবহির্ভূতভাবে ডিঙিয়ে তিনি বিএমইটির অত্যন্ত প্রভাবশালী পদ ‘পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ)’ পদে আসীন হন। সাবেক সরকারের সময়ে প্রভাবশালী মন্ত্রী ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনৈতিক সখ্য গড়ে তুলে তিনি পুরো সংস্থায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন।

জাতীয় দৈনিকগুলোতে তাঁর দুর্নীতির চিত্র প্রকাশিত হলে বিএমইটিজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তীব্র সমালোচনার মুখে সম্প্রতি বিএমইটির মহাপরিচালক (ডিজি) তাঁকে ‘পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ)’ পদ থেকে সরিয়ে ‘পরিচালক (কর্মসংস্থান)’ পদে রদবদল করলেও তাঁর গড়ে তোলা পুরোনো সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় রয়েছে।

দেশে-বিদেশে হাজার কোটি টাকার সম্পদের খতিয়ান

দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগ ও অনুসন্ধানে মাসুদ রানা ও তাঁর স্ত্রী উম্মে ছালমা শেখের নামে-বেনামে অর্জিত যে বিশাল সম্পদের তথ্য মিলেছে, তা চোখ কপালে তোলার মতো:

১. রাজধানীতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট: গুলশান, নিকেতন, ধানমন্ডি এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার মতো চরম অভিজাত এলাকাগুলোতে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর নামে একাধিক সুউচ্চ ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে।
২. উত্তরায় বহুতল ভবন ও সাভারে জমি: রাজধানীর উত্তরার প্রাণকেন্দ্রে দুটি বহুতল আবাসিক ভবন এবং সাভারের আশপাশের এলাকায় শত শত শতাংশ মূল্যবান জমি ও প্লট রয়েছে তাঁর।
৩. গ্রামে মার্বেল পাথরের রাজপ্রাসাদ: নিজ জেলা নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ উপজেলার চানপুর গ্রামে শত শত শতাংশ জমির ওপর নির্মাণ করেছেন দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা। যেখানে কোটি কোটি টাকার মার্বেল পাথর ও মূল্যবান ফিটিংস ব্যবহার করা হয়েছে।
৪. মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’: অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে তিনি ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম’ (MM2H) প্রকল্পের আওতায় অঢেল অর্থ বিনিয়োগ করে সেখানেও সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন।
৫. দুবাইয়ে স্বর্ণ ও জনশক্তি ব্যবসা: সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে এক রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বে বহুতল ভিলা ক্রয়সহ সরাসরি স্বর্ণ ব্যবসা ও ম্যানপাওয়ার খাতে কোটি কোটি টাকা খাটিয়েছেন।

টিটিসির অধ্যক্ষদের ডেকে রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও বদলি বাণিজ্য

বিএমইটির প্রশাসনিক পদে থাকাকালে সারাদেশের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর (টিটিসি) অধ্যক্ষ ও কর্মকর্তাদের ওপর তিনি ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন টিটিসির অধ্যক্ষদের ঢাকায় ডেকে নিজ দপ্তরে দরজা বন্ধ করে ‘রুদ্ধদ্বার বৈঠক’ করতেন তিনি। পছন্দের স্থানে পদায়ন, কেনাকাটার ফাইল অনুমোদন বা প্রশাসনিক সুবিধার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হতো। অনৈতিক লেনদেনে রাজি না হলে দূরবর্তী ও দুর্গম এলাকায় বদলির হুমকি দেওয়া হতো।

লাইসেন্স জালিয়াতি ও প্রবাসীদের ফাইল আটকে চাঁদাবাজি

বিএমইটির মূল কাজ প্রবাসী কর্মীদের ছাড়পত্র দেওয়া ও রিক্রুটিং এজেন্সি তদারকি করা। মাসুদ রানা প্রতিটি নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রদান, তদন্ত রিপোর্ট ও সাধারণ প্রবাসীদের বহির্গমন ছাড়পত্রের ফাইলে দুর্নীতির জাল বিছিয়েছিলেন। ফাইল আটকে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নির্দিষ্ট কমিশন নেওয়া হতো। এছাড়া নিজের ভাইয়ের নামে নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সির আড়ালেও সরকারি সুযোগ-সুবিধা অপব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও সম্পদ ক্রোকের চার দাবি

মাসুদ রানার দুর্নীতির রাজত্ব ভেঙে দিতে এবং অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চার দফা জোর দাবি জানানো হয়েছে:

দাবি ১: মাসুদ রানা, তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের সকল সদস্যের ব্যাংক হিসাব অবিলম্বে ফ্রিজ করা এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও আয়কর নথি তলব করে তা ক্রোক করা।
দাবি ২: বিএফআইইউ ও সিআইডির মাধ্যমে মালয়েশিয়া ও দুবাইয়ে পাচারকৃত অর্থের উৎস উদ্ঘাটন করে বিদেশি ব্যাংকের হিসাব জব্দ করা।
দাবি ৩: আলামত নষ্ট করা কিংবা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া রোধে মাসুদ রানার বিদেশ গমনে আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা।
দাবি ৪: মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের কঠোরতম ধারায় মামলা দায়ের করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।

প্রবাসী আয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা জনশক্তি খাতে বসে এত বড় দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পর এখন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর রাখছে সচেতন মহল।

Link copied!