প্রকাশিত: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৯:২২ পিএম
ঢাকা: 'জুলাই আন্দোলন' বা এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে কোনো প্রকার সমালোচনা করা যাবে না এবং কেউ সমালোচনা করলে তাকে গ্রেফতার করতে হবে—এমন দাবিকে স্পষ্টতই চরম স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা হিসেবে দেখছেন দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন নাগরিক সমাজ। তাদের মতে, ভিন্নমত দমন এবং একটি নির্দিষ্ট এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সম্প্রতি বিভিন্ন মহলে জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে ঢাল বানিয়ে যেকোনো ধরনের ভিন্নমত বা গঠনমূলক সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা।
'জুলাই' কোনো মুক্তিযুদ্ধ নয় যে সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকবে
আলোচকদের মতে, 'জুলাই আন্দোলন' বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও একে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মতো সর্বোচ্চ ও মীমাংসিত জাতীয় গৌরবের সঙ্গে মেলানো যুক্তিযুক্ত নয়। মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম, যা সমালোচনার ঊর্ধ্বে। অন্যদিকে, জুলাই আন্দোলন ছিল একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা গণঅভ্যুত্থান। গণতন্ত্রের মূল শর্তই হলো যে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলন নিয়ে খোলামেলা আলোচনা ও সমালোচনা করার সুযোগ থাকা। একে প্রশ্নাতীত বা স্পর্শাতীত করে তোলা প্রকারান্তরে ফ্যাসিবাদেরই নতুন রূপ।
অপরাধ ও লুটপাট আড়ালের হাতিয়ার 'জুলাই' তকমা
অভিযোগ উঠেছে, বর্তমানে 'জুলাই' বা 'শহীদ'-এর নাম ব্যবহার করে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী তাদের অগণতান্ত্রিক আচরণ, অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং অর্থনৈতিক লুটপাটকে আড়াল করার চেষ্টা করছে।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া: আন্দোলনের নাম ভাঙিয়ে অনেক জায়গায় মব জাস্টিস বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
অর্থনৈতিক অপকর্ম: বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ওপর অনৈতিক চাপ সৃষ্টি এবং আর্থিক সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রেও এই আন্দোলনের আবেগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ মিলছে।
দায়মুক্তি খোঁজার চেষ্টা: যেকোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পর 'জুলাই আন্দোলনের কর্মী' পরিচয় দিয়ে পার পাওয়ার একটি অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
"গণতন্ত্রে কোনো আন্দোলন বা রাজনৈতিক পরিবর্তনই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। 'জুলাই'কে অপ্রশ্নযোগ্য করে তোলার যেকোনো চেষ্টা নাগরিকদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী।"
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সংকট
একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতনের পর যদি নতুন কোনো ব্যবস্থা বা আন্দোলনকে সমালোচনার বাইরে রাখার দাবি তোলা হয়, তবে তা দেশের মানুষের বাকস্বাধীনতাকে চরমভাবে খর্ব করে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্যই যদি হয়ে থাকে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার, তবে সেখানে ভিন্নমতের প্রতি পরম সহিষ্ণুতা থাকা বাধ্যতামূলক। সমালোচনাকে ভয় পেয়ে যদি গ্রেফতার বা দমনের পথ বেছে নেওয়া হয়, তবে তা পূর্ববর্তী স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতারই পুনরাবৃত্তি মাত্র।
একটি সুস্থ ও টেকসই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে যেকোনো আন্দোলনের ভুলত্রুটি নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা এবং গঠনমূলক সমালোচনা হওয়া অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, আন্দোলনের পবিত্রতা নষ্ট করে ব্যক্তিবিশেষের অপরাধ ও এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথই সুগম হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
